বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হলো বুধবার। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় রাজধানী ঢাকায় নেমে আসে জন-মানুষের ঢল। জনসমুদ্র শব্দটিও যেন এই বিশালতার কাছে সামান্য এবং ম্লান হয়ে যায়।
বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর বিকাল তিনটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত জানাযায় অংশ নিতে রাজধানীর মানিক মিয়া এ্যভিনিউ সহ আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা পরিণত হয় জন-মানুষের স্রোতে। যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। লাখো কন্ঠে কান্না জড়িত দোয়া ও নিরবতা শোকস্তব্ধ পুরো এলাকাকে ভারী করে তোলে।
জানাযা স্থল পূর্ণ হয়ে গেলে ভীড় ছড়িয়ে পড়ে উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড, পূর্বে ফার্মগেট রোড হয়ে কাওরান বাজার বাংলা মোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছেছে মানুষ ততদূর পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাযায় শরিক হন।অনেকের চোখে ছিল অশ্রু কেউবা হাত তুলে প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন।
পুরান ঢাকার ৭০ অর্ধ ব্যবসায়ী হাজী আবুল কালাম বলেন ১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম এমন দৃশ্য আর দেখবো না। আজ তার স্ত্রী জানা যায় এসে মনে হচ্ছে ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না এটা আল্লাহর দান।
জানাযায় শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী নয় অংশ নেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, খেটে খাওয়া দিনমজুর সহ সর্বস্তরের মানুষ।ভিড়ের চাপে সংসদ ভবনের আশেপাশের ফুটপাত এমনকি নিকটবর্তী ভবনেরছাদও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
জানাযার ঠিক আগ মুহূর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খাঁন এর আবেগঘন বক্তব্য ও পরে তারেক রহমানের দোয়া চাওয়ার মুহূর্ত পুরো এলাকায় আসে পিন পতন নীরবতা। দেশনেত্রীর বিদায়ে শোক যেন একযোগে ছুয়ে যায় সবাইকে।
এ জানা যায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরব সহ আরো ৩২ টি দেশের প্রতিনিধিরা।জানা যায় অংশ নিয়ে নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায় মূহুর্তে মলিন মুখগুলো।
জানাযায় নারীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। মুল স্থানে প্রবেশ সীমিত থাকলেও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে নারীরাও অশ্রু সজল চোখে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানান। এর মাধ্যমে সমাপ্তি হলো এক হাজারো মহাকাব্যের ইতিহাস। সমাপ্তি হলো৷ মহাকালের মহীয়সী এক নারীর অনন্ত যাত্রা।যার মহাপ্রণায়ে রচিত হলো এক নতুন কাব্যিক ইতিহাস হাজার বছরের এক মহীয়সী নারী।
বিশ্লেষকদের মতে এই জানাযা নামাজ কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় গণ-জমায়েত। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম কারাবাস ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্ষমতার বাইরে থেকেও কিভাবে একজন নেতা গণ মানুষের হৃদয় স্থান করে নিতে পারেন এই বিদায় তারই প্রমাণ।
মো. শরিফুল ইসলাম রনি 








