চট্টগ্রাম বন্দর, বিশেষ করে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), বাংলাদেশের “সোনার হরিণ” বা “স্বর্ণের ডিম পাড়া হাঁস” বলে মন্তব্য করেছেন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক। তিনি বলেন, এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা বা কনসেশনে দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বুধবার (২৩ এপ্রিল ২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জিয়াউল হক বলেন, ২০২০ সালে সালমান এফ রহমান সিন্ডিকেট এবং ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু “ইকোনোমিক হিটম্যান” চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটি স্বর্ণের ডিম পাড়া হাঁস জবাই করার মতো সিদ্ধান্ত হবে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব না বুঝে যদি এটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। সরকারকে অবশ্যই বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার আগে কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করতে হবে—দেশ কী দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কী পাচ্ছে, সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জনগণকে জানাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী ২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০০ বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে স্বপ্ন রয়েছে, এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দিলে তা অধরাই থেকে যাবে।
জিয়াউল হকের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তা দেশের অর্থনীতিকে দুর্ভিক্ষ, বৈদেশিক নির্ভরতা এবং সোমালিয়া, সুদান কিংবা ইয়েমেনের মতো সংকটময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ইজারা বা কনসেশন চুক্তি এবং অপারেটর নিয়োগ এক বিষয় নয়। কনসেশন চুক্তি মূলত একটি পরনির্ভরশীল মডেল, যা সাধারণত দুর্নীতিগ্রস্ত বা দুর্বল রাষ্ট্রগুলো গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষতি, বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার, রাষ্ট্রীয় তথ্য ফাঁস এবং জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর বা এনসিটি কনসেশনে না দিয়ে দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জিয়াউল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুর পোর্টের মতো একটি আঞ্চলিক (রিজিয়নাল) হাবে পরিণত করা সম্ভব। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপিএম টার্মিনালস ও মেডলগের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না বাংলাদেশ এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠুক।
তিনি অভিযোগ করেন, “সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের বন্দর বিদেশিরা চালায়”—এ ধরনের অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাস্তবে সিঙ্গাপুরের কোনো কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে নেই এবং ভিয়েতনামেও কোনো টার্মিনাল এককভাবে বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার যদি দ্রুত পাঁচটি উদ্যোগ নেয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রিজার্ভ ১০০ বিলিয়ন ডলারে এবং অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
এই পাঁচটি উদ্যোগ হলো—
১. বন্দর বিকেন্দ্রীকরণ ও তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা,
২. নিজস্ব শিপিং লাইন চালু করা,
৩. রেমিট্যান্স বাড়াতে আরবি ভাষাকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো,
৪. নদী-খাল খনন,
৫. খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি থানায় প্রয়োজন অনুযায়ী হিমাগার নির্মাণ।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এ বিষয়ে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির গবেষণা টিম কাজ করছে।




