গাজীপুরে আনসার-ভিডিপিকে ‘চেইন অব কমান্ড’ ও কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর শৃঙ্খলা ও ‘চেইন অব কমান্ড’ মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা ও কমান্ড কাঠামোর প্রতি আনুগত্য। এ দুই বিষয়ে সামান্য অবহেলাও বাহিনীর প্রতি জনআস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
আজ বুধবার (২০ মে) সকালে গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘৪৬তম জাতীয় সমাবেশ-২০২৬ : ব্যুত্থান মহড়া প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেকোনো দেশেই একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য চেইন অব কমান্ড এবং ডিসিপ্লিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইটি বিষয় কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে কোনো বাহিনী প্রকৃত অর্থে সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না।”
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাহিনীর কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তৃণমূলের সদস্যদের অভিনন্দন জানান। মহান মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং ৬৭০ জন সদস্য শহীদ হন। তিনি শহীদ সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাত্তোর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গ্রাম ও নগর পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভিডিপি ও আনসার বাহিনীকে শক্তিশালী ও কার্যকর বাহিনীতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে আনসার-ভিডিপি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাহিনীটি স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো থেকে একটি স্বতন্ত্র সুশৃঙ্খল বাহিনীর মর্যাদা পায়।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় আনসার ও ভিডিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবাতেও বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় অবদান রাখছেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাহিনীর ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি দপ্তর, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন। ১৩ হাজারের বেশি হিল আনসার ও হিল ভিডিপি সদস্য পার্বত্য এলাকায় সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করছেন।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমেও ভিডিপি প্লাটুনগুলোর অবদানের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং সিক্স-জি ওয়েল্ডিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ‘এফ জবস’ নামে আনসার ও ভিডিপির জব পোর্টাল সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এছাড়া আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ক্রীড়াঙ্গনে বাহিনীর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ গেমসে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক অর্জন করে। বর্তমানে দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
বাহিনীর আধুনিকায়নে বিভিন্ন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা-২০২৬, ভিডিপি বিধিমালা-২০২৬ এবং সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা। উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে উপজেলা আনসার প্রবিধিমালাও প্রণয়ন করা হচ্ছে।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আনসার ও ভিডিপি বাহিনী ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন