দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের এক শাখা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে এক সেবাগ্রহীতার স্বজন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও সাংবাদিককে প্রকাশ্যে ‘দালাল’ ও ‘পাগল’ বলে গালিগালাজসহ চরমভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
জানা যায়, উপজেলার বানিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা কবিতা রানী সাহার নামে সম্প্রতি ৮২ হাজার ১৪৭ টাকা বকেয়া পরিশোধের একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ওই নোটিশে কবিতা রানীর স্বামী বিকাশ সাহার নামের পরিবর্তে তার দেবর প্রকাশ সাহার নাম উল্লেখ করা হয়। সরকারি নথিপত্রে এমন গুরুতর ভুল এবং বকেয়া টাকার হিসাব নিয়ে অসঙ্গতি দেখা দিলে গত ১৫ মার্চ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ব্যাংকে যান প্রকাশ সাহা। তার সঙ্গে ঘটনার সত্যতা যাচাই ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও একজন সংবাদকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, লিগ্যাল নোটিশের ভুল এবং ঋণের কিস্তির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই শাখা ব্যবস্থাপক অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। তিনি তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা না দিয়ে উল্টো উপস্থিত শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও সাংবাদিককে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে ‘দালাল’ ও ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেন। এ সময় তিনি প্রকাশ সাহাকেও চরমভাবে অপদস্থ করেন এবং অফিস কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন অপেশাদার ও কুরুচিপূর্ণ আচরণে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়েন।
ভুক্তভোগী কবিতা রানী সাহা অভিযোগ করে বলেন, “ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বিভিন্ন সময় আমাদের বাড়িতে গিয়ে কিস্তির টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন। অথচ সেই টাকা ব্যাংকের মূল হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। উল্টো এখন আমার স্বামীর নামের জায়গায় দেবরের নাম বসিয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আমার দেবর এই ভুলের বিষয়ে জানতে গেলে ম্যানেজার সাহেব তাকে ও সাংবাদিক ভাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। তিনি মূলত নিজের অফিসের দুর্নীতি ঢাকতেই এমন আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন।”
বিষয়টি নিয়ে সোমবার (১৬ মার্চ) কয়েকজন সংবাদকর্মী ওই কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, “গতকাল আমার ছেলের পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সমস্যার কারণে মাথা ঠিক ছিল না।” তবে বাড়ির রাগ অফিসে দেখানো ঠিক কি না—এমন প্রশ্ন করলে তিনি আবারও ক্ষিপ্ত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং বলেন, “আপনারা আসছেন টাকা পরিশোধ করেন,” বলে চেয়ার থেকে উঠে চলে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের এক কর্মচারী জানান, ওই ম্যানেজারের ব্যবহার অত্যন্ত রূঢ় এবং তিনি প্রায়শই সেবাগ্রহীতা ও সহকর্মীদের সঙ্গে তুচ্ছ কারণে মেজাজ হারান।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী এই কর্মকর্তার দম্ভের আড়ালে বড় ধরনের কোনো আর্থিক জালিয়াতি লুকিয়ে থাকতে পারে। অবিলম্বে তাকে অপসারণ করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানি থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে দিনাজপুর পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আঞ্চলিক অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভিডিও পাঠান, আমরা মৌখিকভাবে তাকে সতর্ক করবো।” অপরদিকে সেবাগ্রহীতা লিখিত অভিযোগ দিলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি। এখানেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়সারা মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জানান, ভিডিও ফুটেজটি তিনি দেখবেন। বর্তমানে তিনি দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আছেন, ফিরে এসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
ক্যাপশন: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তার আঙুল তুলে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ।




