
কাউখালী উপজেলায় ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে চারটি কলেজের মধ্যে পাসের হার শীর্ষস্থান অর্জন করেছে বেতবুনিয়া কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েই উপজেলার অন্য তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি আগামী দিনে আরও ভালো ফলাফল অর্জনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে উপজেলার অন্য ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল তুলনামূলকভাবে হতাশাজনক হওয়ায় শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর বেতবুনিয়া কলেজ থেকে মোট ৫৯ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৯ জন। এতে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে ৩৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৩৪ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঘাগড়া কলেজ থেকে ৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ জন। সেখানে পাসের হার ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। অপরদিকে, সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৫ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি কেউ। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শূন্য শতাংশ।
চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বেতবুনিয়া কলেজ পাসের হারে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এই ফলাফল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে উপজেলার সামগ্রিক এইচএসসি ফলাফল প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।এদিকে খুব ভালো ফলাফল না করলেও সন্তোষজন ফলাফল করায় সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানাতে দেখা গেছে বেতবুনিয়া কলেজ কে। এবিষয়ে বেতবুনিয়া কলেজ পরিচালনা কমিটির দাতা প্রতিনিধি ও জেলা বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এম এস মনছুর জানান, আমাদের কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যে চেষ্টা ছিলো সে অনুযোয়ী এ ফলাফল আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত। এটা নতুন কলেজ, এবারই প্রথম ব্যাচ এইচএসসি পরিক্ষা দিয়েছে। এবারের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে সামনের পরিক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি আরও ভালো করবে বলে আশাবাদী তিনি।বেতবুনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ জোসেফ চাকমা বলেন, এ বছর তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম ব্যাচের ৫৯ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচ হিসেবে এ ফলাফলকে তাঁরা মোটামুটি সন্তোষজনক মনে করছেন। কাউখালী উপজেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলের তুলনায় তাঁদের কলেজের ফলাফল ভালো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য শুরু থেকেই শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়নি, শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না, পড়ালেখায় কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়েও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে শিক্ষকমণ্ডলী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।অধ্যক্ষ আরও বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফল অর্জনের পেছনে শুধু শিক্ষকদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, অভিভাবকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পেছনে শিক্ষকমণ্ডলীর অক্লান্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের যথেষ্ট সহযোগিতা ও প্রচেষ্টা ছিল। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই প্রথম ব্যাচ থেকে এমন ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জোসেফ চাকমা বলেন, প্রথম ব্যাচের ফলাফল তাঁদের আরও উৎসাহিত করেছে। তবে তাঁরা এ ফলাফলেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। আগামী বছর আরও ভালো ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবেন। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পাঠদানের মান বাড়ানো, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে শিক্ষার মান আরও উন্নত করার চেষ্টা করবেন তাঁরা।তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর বেতবুনিয়া কলেজ আরও ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে।অন্যদিকে, কাউখালীর দুর্গম এলাকায় অবস্থিত সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফলাফল এবার সন্তোষজনক হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এ বছর মাত্র ৫ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এতে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশ।এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নন্দিতা চৌধুরী বলেন, তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় শিক্ষার পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল অর্জনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করে আসছে। অতীতে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য শিক্ষকরা নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ ফলাফল তাঁদের জন্য হতাশাজনক হলেও ভবিষ্যতে আরও ভালো করার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী।নন্দিতা চৌধুরী আরও বলেন, আগামীতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, নিয়মিত পাঠদান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষভাবে সহযোগিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতে যে ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ছিল, তা পুনরুদ্ধার করাই এখন তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার পেছনে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নন্দিতা চৌধুরী।অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমানে স্মার্টফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কনটেন্টে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।তিনি মনে করেন, সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে এবং পড়াশোনায় কতটা সময় দিচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত নজরদারি রাখা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় স্মার্টফোন ব্যবহার থেকে বিরত রেখে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে।তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা পাওয়া গেলে সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আগামীতে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের হারানো সাফল্যের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে পারবে।এদিকে, কাউখালী উপজেলার সাবেক ইউপি সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বলেন, উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে পাসের হারে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। বেতবুনিয়া কলেজের প্রথম ব্যাচের ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ পাসের হার প্রতিষ্ঠানটির জন্য ইতিবাচক অর্জন। অন্যদিকে, কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও ঘাগড়া কলেজের তুলনামূলক কম পাসের হার উদ্বেগের বিষয়।তিনি বলেন, বিশেষ করে পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে থাকা কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের মাত্র ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ পাসের হার শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।আব্দুল মোতালেব আরও বলেন, ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং পরীক্ষার আগে যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।তিনি আরও বলেন, সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল কাউখালীর শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। বেতবুনিয়া কলেজের প্রথম ব্যাচের ফলাফল নতুন প্রতিষ্ঠানটির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও উপজেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল উন্নয়নে প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগ।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামীতে কাউখালীর শিক্ষার মান ও পরীক্ষার ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।





