
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সাবেক কানুনগো এবং বর্তমানে অতিরিক্ত ভূমি কর্মকর্তা (এএলও) হিসেবে কর্মরত মোঃ শহিদুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের চেক প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম, হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রভাব খাটিয়ে একই শাখায় পদোন্নতি, ৫ কোটি টাকার ঊপরে দুর্নীতি এবং বরিশালে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও পায়রা বন্দরসহ জেলার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য জমি দেওয়া সাধারণ মানুষ এই কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
একাধিক ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের চেক ছাড় করতে এই কর্মকর্তা এবং এলএ শাখার একটি নির্দিষ্ট চক্র নথির প্রকারভেদে মোট টাকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দাবি করছে। যারা এই অন্যায্য দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তাদের ফাইলে নানা অজুহাতে ত্রুটি ধরা হচ্ছে এবং মাসের পর মাস ঘুরিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পটুয়াখালী সদরের এক ভুক্তভোগী বলেন, “পায়রা বন্দরের জন্য আমাদের পৈত্রিক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জমির সব বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও চেক ছাড় করার জন্য আমার কাছে ১০ শতাংশ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় গত ছয় মাস ধরে আমার ফাইলটি আটকে রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভুক্তভোগীরা বারবার অভিযোগ দিয়েছেন এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির খবর প্রকাশিতও হয়েছে এত সব গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পটুয়াখালীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী একই শাখার অন্য অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি বা শাস্তির আওতায় আনলেও এই প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে রহস্যজনক ভাবে স্বপদে বহাল রাখেন। শুধু তাই নয়, উপর মহলের তদবির ও রাজনৈতিক সুপারিশের জোরে তাকে একই জেলার একই শাখায় কানুনগো থেকে অতিরিক্ত ভূমি কর্মকর্তা (এএলও) পদে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করা হয়, যা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও স্থানীয় মহলে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল শহরের জিয়া সড়কে তার একটি পাঁচ তলা বিশিষ্ট আলিশান বাড়ি রয়েছে এছাড়াও শহরের আমতলার মোড় এবং রূপাতলী হাউজিং এলাকায় তার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকা। একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় দিয়ে এই ধরনের সম্পদ অর্জন করা অসম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বর্তমান জেলা প্রশাসকের কাছে অপসারণের দাবি
এই কর্মকর্তার দুর্নীতি ও জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে পটুয়াখালীর বর্তমান সদ্য যোগদান করা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলার ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, বর্তমান জেলা প্রশাসকের সততা ও কর্মদক্ষতার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। তাই এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে অবিলম্বে এই স্পর্শকাতর শাখা থেকে অপসারণ ও বদলি করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন তারা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ঘুষ, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদের বিষয়টি অস্বীকার করে দাবি করেন, “কাগজপত্রে জটিলতা থাকলে আইন অনুযায়ী ফাইল আটকে থাকে। এখানে কোনো প্রকার ঘুষ নেওয়া হয় না। আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
পটুয়াখালীর বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বলেন, “ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহি মূলক করার প্রক্রিয়া চলছে। সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, হয়রানি বা অনিয়ম নিয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষ কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা করা হবে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এই কর্মকর্তার ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন।এছারাও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।




