কথা বলতে পারে না, হাঁটতেও পারে না ৩ ফুটের তুলির নীরব জীবন,মেয়ের জন্য বাবা-মায়ের আকুতি

কথা বলতে পারে না, হাঁটতেও পারে না মাত্র ৩ ফুট উচ্চতার তুলি আক্তার। জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী বয়স ২৪ বছর। বয়স বাড়লেও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি তার শরীর। জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা তুলির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অন্যের ওপর নির্ভর করে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বাবা-মায়ের সঙ্গে নীরবে দিন কাটছে তুলির। বাবা পেশায় একজন জেলে। নদীতে মাছ ধরে যে সামান্য আয়, তা দিয়েই চলে সংসার। সেই আয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি মেয়ের চিকিৎসা, খাবার ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি। মাত্র ৩ ফুট উচ্চতার তুলি। ২৪ বছর বয়স হলেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, কথা বলেও নিজের প্রয়োজন জানাতে পারে না। কখন ক্ষুধা লাগছে, কখন শরীর খারাপ করছে কিংবা কখন চিকিৎসার প্রয়োজন সবকিছুই বুঝতে হয় পরিবারের সদস্যদের।
কথা বলতে না পারা এই মানুষটিরও রয়েছে অনুভূতি, ভালোবাসা এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। পরিবারের সদস্যদের স্নেহ আর যত্নেই প্রতিদিন পার হচ্ছে তার জীবন।
তুলির মা মর্জিনা বেগমের কাছে তুলি শুধু একজন প্রতিবন্ধী সন্তান নয় তুলি তার বুকের ধন। মেয়ের মুখে কথা নেই, তাই তুলির প্রয়োজন বুঝতে হয় মায়ের চোখে-মুখে তাকিয়ে। মেয়ের সামান্য অসুস্থতা কিংবা অস্বস্তিও মায়ের মনে তৈরি করে বড় দুশ্চিন্তা। সারাদিন মেয়েকে আগলে রাখাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
মর্জিনা বেগম বলেন, মেয়ের শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের কারণে সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়। মেয়ের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাবার ও সরকারি সহায়তার পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ চান।
পরিবারের ভাষ্য, তুলির নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু অভাবের সংসারে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে মেয়ের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবারের খরচ বহন করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে মেয়েকে আগলে রেখেছেন বাবা-মা।
তুলির বাবা মোঃ আবজাল শেখ পেশায় একজন জেলে। নদীই তার কর্মক্ষেত্র, নদীতে মাছ ধরেই চলে সংসার। কখনো জালে মাছ আসে, কখনো আবার খালি হাতে ফিরতে হয়। মাছ পাওয়া না গেলে আয়ও থাকে না। এই অনিশ্চিত আয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি মেয়ের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে তাকে।
আবজাল শেখ জানান, মেয়ের চিকিৎসা ও দেখাশোনার প্রয়োজন থাকলেও সীমিত আয়ের কারণে সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। তিনি মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী সহযোগিতার ব্যবস্থা করার আবেদন জানান। তুলির রয়েছে সরকারি প্রতিবন্ধী কার্ড। তবে পরিবারের দাবি,বর্তমানে পাওয়া সহায়তা তুলির চিকিৎসা, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
এ বিষয়ে মোংলা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান,প্রতিবন্ধী হিসেবে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের জন্য সরকারের নির্ধারিত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তুলির ক্ষেত্রে প্রাপ্য সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি যাচাই করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান। শুধু সরকারি সহায়তাই নয়, তুলির শারীরিক অবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দরকার বলে মনে করছে পরিবার।
এ বিষয়ে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ শাহীন জানান, তুলির শারীরিক অবস্থা প্রয়োজনীয় মেডিকেল মূল্যায়নের মাধ্যমে দেখে তার জন্য কী ধরনের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আওতায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান। তুলি কথা বলতে পারে না। তাই সে বলতে পারে না কখন তার ক্ষুধা লাগে, কখন শরীর খারাপ করে, কখন তার চিকিৎসার প্রয়োজন। শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকে। আর সেই নীরব চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন তার মা। ২৪ বছরের এই নারীর চাওয়া হয়তো খুব বেশি কিছু নয় একটু যত্ন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় খাবার আর নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। তুলির পরিবার কারও করুণা চায় না। তাদের চাওয়া মেয়েটির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হোক, প্রয়োজনীয় খাবার নিশ্চিত হোক এবং ভবিষ্যতের জন্য সরকারি সহায়তার পাশাপাশি একটি স্থায়ী সহযোগিতার ব্যবস্থা হোক। একজন বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান, একজন মা সারাদিন মেয়েকে আগলে রাখেন। আর তুলি নীরবে তাকিয়ে থাকে বাবা-মায়ের দিকে। হয়তো মুখে কিছু বলতে পারে না, কিন্তু সেই নীরব চোখেই লুকিয়ে আছে অনেক কথা।
তুলি কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার নীরব চোখ যেন একটি প্রশ্ন করে“আমারও কি একটু ভালোভাবে বাঁচার অধিকার নেই?”
এই প্রশ্নের উত্তর তুলির মুখে নেই। আছে শুধু তার নীরব চোখে আর বাবা-মায়ের অসহায় আকুতিতে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় খাবার এবং সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো বদলে যেতে পারে তুলির নীরব জীবন।কথা বলতে না পারলেও তুলিরও আছে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন