আজ প্রচণ্ড গরমের পর শক্তিশালী সঞ্চালনশীল বজ্রমেঘের সৃষ্টি, প্রচুর বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টি, এরপর রাতের আকাশজুড়ে অস্বাভাবিক লালচে বা কমলা আভা দেখা গেছে চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক এলাকায়। এমন দৃশ্য অনেকেরই কৌতূহল তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঘটনাটি রাত ১২-১ টার দিকেও ঘটার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে সূর্য তো দিগন্তের নিচে, তাহলে আকাশ লাল হলো কীভাবে?
এর সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো ঘন মেঘে কৃত্রিম আলোর ছড়িয়ে পড়া ও প্রতিফলন (scattering ও reflection)।
শক্তিশালী বজ্রঝড়ের সময় শক্তিশালী উল্লম্ব বজ্রমেঘ (Cumulonimbus মেঘ) দ্রুত বিকশিত হয়। এর নিচের অংশে প্রচুর জলকণা থাকে এবং ঝড়বৃষ্টির পরও অনেক সময় নিচু ও ঘন মেঘের স্তর বজায় থাকে।
অন্যদিকে, রাতের শহর বা জনবসতি থেকে নির্গত বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম আলো, বিশেষ করে উষ্ণ হলুদ, কমলা ও লালচে বর্ণের আলো উপরের এই মেঘের স্তরে পৌঁছায়।
এরপর মেঘের অসংখ্য জলকণা ও বরফকণার মাধ্যমে সেই আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়।
সহজভাবে বলা যায়:
শহর/জনবসতির কৃত্রিম আলো থেকে নিচু ও ঘন মেঘে আলো পৌঁছায়। তারপর জলকণা ও বরফকণায় বিকিরণ হয় (scattering ও reflection)। এরপর বিস্তৃত মেঘের স্তর আলোকিত হয়। এরফলে দূর থেকে আকাশে লালচে/কমলা glow/আভা দেখা যায়।
আজকের প্রচণ্ড গরমের ভূমিকা কী?
প্রচণ্ড গরম নিজে আকাশকে লাল করে না। তবে তীব্র উত্তাপের ফলে ভূমির কাছাকাছি বায়ু উত্তপ্ত হয়ে শক্তিশালী convection/পরিচলন তৈরি করতে পারে। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে এই convection/পরিচলন দ্রুত শক্তিশালী বজ্রমেঘে পরিণত হতে পারে।
ফলে যা ঘটে: প্রচণ্ড গরম এর পর শক্তিশালী convection/সঞ্চালন এরপর বিশাল বজ্রমেঘ এরপর বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টি এরপর ঘন/নিচু মেঘ ও উচ্চ আর্দ্রতা তারপর কৃত্রিম আলোর ব্যাপক scattering/বিক্ষেপ এর মাধ্যমে লালচে বা কমলা আকাশ।
বজ্রপাতের ভূমিকা কি?
বজ্রপাতের কিছু ভূমিকা থাকতে পারে, তবে ছবির মতো দীর্ঘসময় ধরে বিস্তৃত লালচে আভা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বজ্রপাতের আলোক এর পরিবর্তে শহরের আলো বেশি গ্রহণযোগ্য।
বজ্রপাতের আলো সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য মেঘকে উজ্জ্বল করে। বিপরীতে, নিচু ঘন মেঘে শহরের আলো প্রতিফলিত হলে পুরো মেঘের স্তর অনেকক্ষণ ধরে আলোকিত দেখাতে পারে।
তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বজ্রপাতের মুহূর্তে আভা আরও উজ্জ্বল হতে পারে, কিন্তু মূল background glow এর উৎস হতে পারে নিচের কৃত্রিম আলো।
ক্যামেরার প্রসেসিং এ বেশি লালচে দেখায় কিনা?
মানুষের চোখের তুলনায় মোবাইল ক্যামেরা রাতে ভিন্নভাবে আলো ধারণ করে। Low-light photography তে ক্যামেরা exposure, white balance এবং computational image processing ব্যবহার করে।
ফলে বাস্তবে চোখে যে আভা তুলনামূলক কম লাল মনে হচ্ছে, ছবিতে সেটি অনেক বেশি লাল বা কমলা দেখা যেতে পারে। তাই ছবির রঙের সাথে সরাসরি আকাশের প্রকৃত রঙের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
এটি কি কোনো বিরল বা রহস্যময় ঘটনা?
না। এটি মূলত একটি বায়ুমণ্ডলীয় অপটিক্যাল ঘটনা অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলের মেঘ, জলকণা এবং আলোর পারস্পরিক ক্রিয়ার ফল।
বিশেষ করে ঘন মেঘে ঢাকা শহর বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়তে পারে।
সুতরাং, রাত ১২-১টার মতো সময়ে এমন বিস্তৃত লালচে আকাশ দেখলে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো: শক্তিশালী বজ্রঝড়ের পর থাকা ঘন মেঘের স্তরে শহর বা জনবসতির কৃত্রিম আলোর বিক্ষেপ ও বিকিরণ (scattering ও reflection)। এটি অন্য কোন বড় দূর্যোগের আভাস নয়।
© বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (BWOT)