প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ২:৫৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ৬:২৩ এ.এম
দেশে জ্বালানি সংকট ক্রমেই অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কোথাও আবাসিক গ্রাহকের রান্নার কাজে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় আমদানির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক উৎস থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেরিটাইম এম্বাসেডর ও সাউথ এশিয়ান স্ট্রাটেজিক কংগ্রেসের ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদারের মতে, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর বাংলাদেশ বড় একটি সামুদ্রিক অঞ্চলের ওপর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের অধিকার পেয়েছে। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর চট্টগ্রাম উপকূল থেকে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাঁর দাবি, একই বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ভারত ও মিয়ানমার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সমুদ্রে অনুসন্ধান সক্ষমতার ঘাটতি
ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার বলেন, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় নিজস্ব জাহাজ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। সীমিত সক্ষমতার নৌযান ব্যবহার করে উপকূলীয় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হলেও এতে গভীর সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।
তিনি সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘ওশান স্যাম্পল কালেক্টিং’ বোট সংগ্রহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের নৌযান থাকলে উপকূল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে টানা কয়েকদিন সমুদ্রের বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অগ্রগতি
রেদওয়ান সিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর ও রাখাইন উপকূলীয় এলাকায় উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুদ শনাক্ত করেছে এবং বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশেও গ্যাস সরবরাহ করছে।
অন্যদিকে ভারতও কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা, আন্দামান সাগরসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গভীর ও অতি গভীর সমুদ্রেও নতুন হাইড্রোকার্বন মজুদের সন্ধানে দেশটি জরিপ ও কূপ খননের কাজ করছে।
ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদের বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রেদওয়ান সিকদার। তাঁর মতে, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে মিল থাকায় সেখানে অনুসন্ধানে সাফল্য এলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট এলাকাতেও সম্ভাবনার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে।
২৬ ব্লকে ভাগ সমুদ্র এলাকা
বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চল তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্র এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক অনুসন্ধান কার্যক্রমের অভাবে এসব ব্লকে প্রত্যাশিত গতি আসেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন কারণে তা স্থায়ী হয়নি। ২০০৮ সালের মডেল পিএসসি অনুসরণ করে কনোকোফিলিপসকে গভীর সমুদ্রের ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ ব্লক দেওয়া হয়েছিল। তবে আর্থিক শর্ত নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালে ব্লক দুটি ছেড়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ ব্লকের জন্য কনোকোফিলিপস ও স্টেট অয়েল যৌথভাবে দরপ্রস্তাব জমা দিলেও পরবর্তীতে কনোকোফিলিপস সরে যাওয়ায় ওই উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
নতুন বিডিং রাউন্ডে প্রত্যাশা
তবে বর্তমানে নতুন করে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’-এর আওতায় অগভীর ও গভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন গতি আসতে পারে।
রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার মনে করেন, শুধু বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সমুদ্রে কূপ খনন, রিগ পরিচালনা, লগিং, সিসমিক জরিপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তব কাজের সুযোগ দেওয়া হলে ধীরে ধীরে নিজস্ব দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হবে। পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত অভিজ্ঞ বাংলাদেশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের দেশে ফিরিয়ে এনে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যর্থতার আশঙ্কায় অনুসন্ধান বন্ধ নয়
বিশ্বব্যাপী তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সব কূপে সাফল্য পাওয়া যায় না। ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি কূপ খননের পর একটি কূপে সাফল্য পাওয়াকে স্বাভাবিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে অনুসন্ধানে তুলনামূলক ভালো সাফল্যের হার থাকার পরও শুধু ব্যর্থতার আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম সীমিত রাখা যুক্তিযুক্ত নয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত সফটওয়্যার, রিগ ও ড্রিলিং প্রযুক্তি এবং দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
তাঁর মতে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশেও জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্র ও স্থলভাগের সম্ভাব্য সব উৎস নিয়ে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক অনুসন্ধান চালানোর বিকল্প নেই।