মায়ের ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই হার মানে”—এই বহুল উচ্চারিত কথাটিই যেন বাস্তবে প্রমাণ করলেন শরীয়তপুরের জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকার বাসিন্দা নাসিমা সুলতানা। বিশ্ব মা দিবসে নিজের ছেলে নাসিম জাহান আকাশের জীবন বাঁচাতে একটি কিডনি দান করেছেন তিনি। মায়ের এই আত্মত্যাগের ঘটনায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে গভীর আবেগঘন পরিবেশ।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় নয় মাস আগে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আকাশ। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনিই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। এরপর থেকেই হাসপাতাল, চিকিৎসক ও নিয়মিত ডায়ালাইসিসের মধ্য দিয়ে কাটছিল তার জীবন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।
সন্তানকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি মা নাসিমা সুলতানা। শেষ পর্যন্ত ছেলের জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দানের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নাসিমা সুলতানা স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। একজন শিক্ষক হিসেবে যেমন শিক্ষার্থীদের পথ দেখান, তেমনি একজন মা হিসেবে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি।
রোববার (১০ মে) বিশ্ব মা দিবসেই ঢাকায় আকাশের কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করবেন দেশের খ্যাতিমান কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও ইউরোলজিস্ট ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প খরচে কিডনি প্রতিস্থাপন ও মানবিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কারণে তিনি দেশজুড়ে প্রশংসিত।
আকাশের বড় বোন বৃষ্টি বলেন,
“আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য মা নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়ে দিচ্ছেন। পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হয় না। মা দিবসে এটাই আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় অনুভূতির মুহূর্ত। সবাই মা ও ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন,
“অনেক ঘটনা শুনেছি, কিন্তু একজন মা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সন্তানের জন্য কিডনি দিচ্ছেন—এটা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। ঘটনাটি শুনে আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি।”
জাজিরা উপজেলার শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবির বলেন,
“নাসিমা ম্যাডাম সবসময়ই একজন মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে আজ তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা একজন মায়ের ভালোবাসার সর্বোচ্চ উদাহরণ হয়ে থাকবে।”
স্থানীয় সমাজকর্মী জাহিদ হাসান বলেন,
“মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আবেগঘন পোস্ট দেন। কিন্তু একজন মা সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের অঙ্গ দান করছেন—এটাই প্রকৃত মাতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।”
এদিকে উত্তর বাইকশা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, আকাশের সুস্থতা কামনায় স্থানীয়রা দোয়া ও প্রার্থনা করছেন। অনেকে হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মা-ছেলের জন্য দোয়া চেয়ে পোস্ট করছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে মায়ের সম্পর্কই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে একজন মা নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারেন। শরীয়তপুরের এই ঘটনাও সেই চিরন্তন সত্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ব মা দিবসে মায়ের এই আত্মত্যাগের গল্প শুধু শরীয়তপুর নয়, ছুঁয়ে গেছে সারা দেশের মানুষের হৃদয়। কারণ, পৃথিবীর সব অনুভূতির ওপরে সবচেয়ে গভীর শব্দটি হলো—‘মা’।



