ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাজারে আগাম শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে মাছ ও ডিমের দাম। তবে স্বস্তির এই চিত্রের বিপরীতে বেড়েছে চাল ও মুরগির দাম। এতে নিত্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সামগ্রিক সংসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আনন্দ বাজার, জগত বাজার, মেড্ডা বাজার ও কাউতলী বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় কিছু পণ্যের দাম কমেছে। অন্যদিকে পুরোনো চালের সরবরাহ কমে আসা এবং মুরগির মৃত্যুহার বাড়ার আশঙ্কাকে দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সবজিতে কিছুটা স্বস্তি
বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, কাঁচা মরিচ, ঢেঁড়স, বেগুন, শসা, করলা, ধনেপাতা, টমেটো ও লাউয়ের দাম কমেছে।
বর্তমানে প্রতি পিস ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৬০ টাকা। বাঁধাকপির দাম ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা হয়েছে। প্রতি কেজি পটল ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা থেকে কমে ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৯০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ৮০ টাকা থেকে কমে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া হাইব্রিড শসা ১০০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা, করলা ৯০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা, ধনেপাতা ১০০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা এবং টমেটো ১২০ টাকা থেকে কমে ১০০ টাকা হয়েছে। আকারভেদে লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০ থেকে ১০০ টাকা।
সবজি বিক্রেতা মাহবুব বলেন, বাজারে ক্রেতার তুলনায় চাহিদা কম এবং শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে। এ কারণে কয়েক ধরনের সবজির দাম কমেছে।
চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতি
সবজির বাজারে স্বস্তি ফিরলেও চালের বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৫ কেজির বস্তায় বিভিন্ন ধরনের চালের দাম ৭০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ চালের ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ২৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ২৯ চাল ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৩০ টাকা, নাজিরশাইল ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা, কাটারিভোগ ১ হাজার ৯৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং মিনিকেট চাল ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মৌসুমি বোরো চালের। ২৫ কেজির বস্তা গত সপ্তাহে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।
চালের দাম বাড়ার বিষয়ে আনন্দ বাজারের মেসার্স জালাল এন্টারপ্রাইজের প্রবাস উদ্দিন বলেন, বর্তমান মৌসুমে পুরোনো চালের মজুত শেষ পর্যায়ে। ফলে পুরোনো চালের চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে।
বেড়েছে মুরগির দাম
চালের পাশাপাশি মুরগির বাজারেও বাড়তি দামের চাপ রয়েছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ টাকা।
এ ছাড়া লেয়ার মুরগি ৩২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ২৯০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আনন্দ বাজারের আল্লাহর দান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রাশেদ মিয়া বলেন, শীত মৌসুমে মুরগির বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাজারে মুরগির দাম বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
কমেছে মাছ ও ডিমের দাম
সবজি ও মাছের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি রুই মাছ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা কমে ৩২০ টাকা হয়েছে। কাতলা ৪০০ টাকা থেকে কমে ৩৫০ টাকা, ঘাসকার্প ৩২০ টাকা থেকে কমে ২৯০ টাকা, কার্ফু মাছ ৩০০ টাকা থেকে কমে ২৮০ টাকা এবং পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া ২২০ টাকা থেকে কমে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আনন্দ বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শিপলু ও ওয়াসিম মিয়া বলেন, মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রেতার সংখ্যা কম থাকে। পাশাপাশি নদীর পানি কমে যাওয়ায় চাষের মাছের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণে মাছের দাম কিছুটা কমেছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহে প্রতি হালি ডিমের দামও কমেছে ৪ থেকে ৫ টাকা। লাল ডিম ৫০ টাকা থেকে কমে ৪৬ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৪ টাকা থেকে কমে ৬০ টাকা এবং দেশি ডিম ৮৫ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থিতিশীল অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম
বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, দেশি রসুন ৮০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০ টাকা, আদা ১৪০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৫০ টাকা এবং মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার টাকা, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০৮ টাকা, ডায়মন্ড আলু ২০ টাকা এবং দেশি আলু ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
‘আয় কচ্ছপের মতো, ব্যয় খরগোশের মতো’
বাজারে সবজির দাম কমলেও চাল ও মুরগির দাম বাড়ায় স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। তাঁদের মতে, কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও পরিবারের মোট ব্যয় কমছে না। বরং চাল, ডাল, তেল ও মাংসের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব মেলাতে হচ্ছে।
বাজারে সবজি কিনতে আসা শিক্ষক আবদুল্লাহ বলেন, “বাজারের সবকিছুই নাগালের বাইরে। সবজির দাম আপাতত কমলেও অন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের আয় হয় কচ্ছপের মতো আর ব্যয় হয় খরগোশের মতো।”
মাছ কিনতে আসা ক্রেতা নীহার রঞ্জন সরকার বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় মাছের দাম কিছুটা কমেছে। তবে দাম বাড়ার সময় যে পরিমাণ বাড়ে, কমার সময় সে তুলনায় কমে না। এ কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মেড্ডা বাজারে সবজি কিনতে আসা রইস মিয়া বলেন, “বর্তমানে বাজারের অবস্থা টালমাটাল। মধ্যবিত্ত পরিবারে এখন তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়ার দিন শেষ। সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে পারি না, মাছ কিনতে পারলে মাংস কিনতে পারি না।”
বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে আগামী দিনগুলোতে কিছু সবজির দাম আরও কমতে পারে। তবে চাল ও মুরগির দাম বাড়তি থাকায় সামগ্রিক বাজার ব্যয়ে স্বস্তি ফেরেনি।
সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও কারসাজি প্রতিরোধ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের মতে, বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেই চলবে না; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।