ভেদরগঞ্জে জ্বালানি তেল সংকট, নদীতে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় কয়েকদিন ধরে চলমান জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপজেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেলেও অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। কোথাও আবার সীমিত পরিসরে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, যানবাহন চালক ও বিশেষ করে পদ্মা নদীনির্ভর জেলেরা।

ডিজেলের সংকটের কারণে উপজেলার অধিকাংশ জেলে নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। ফলে নৌকা তীরে রেখে অলস সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন জেলে সম্প্রদায়ের মানুষজন।

উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ জন হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত প্রায় ১৫ হাজার ইঞ্জিনচালিত ছোট-বড় নৌকা ও ট্রলার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার নৌকা নিয়মিত পদ্মা নদীতে মাছ শিকারে যায়। এসব নৌকায় প্রতিদিন আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।

তেলের সংকটের কারণে বর্তমানে মাত্র ১০ শতাংশ জেলে কোনোভাবে ডিজেল সংগ্রহ করে নদীতে নামতে পারছেন। অধিকাংশ নৌকা নদীর পাড় ও আড়তের পাশে নোঙর করে রাখা হয়েছে। অনেক মাঝিকে নৌকায় বসে জাল বুনতে, ছেঁড়া জাল মেরামত করতে কিংবা চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে দেখা গেছে।

উপজেলায় থাকা দুটি ফিলিং স্টেশনে গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। শনিবার সকালে সীমিত আকারে সরবরাহ শুরু হলেও চাহিদার তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। সাধারণত জেলেরা নদীপাড়ের খোলা দোকান থেকে তেল সংগ্রহ করলেও বর্তমানে সেখানেও তেল সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও তেল পাওয়া গেলেও নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আগে যেখানে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০–১০৫ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে এখন ১৫০–১৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সংকটকে পুঁজি করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন।

কাচিকাটা এলাকার জেলে রহিম হাওলাদার, যিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন, বলেন,
“পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তিন দিন ধরে নদীতে যেতে পারছি না। এক লিটার ডিজেল ১৭০ টাকা দিয়ে কিনেছি, কিন্তু এত অল্প তেলে নদীতে নামা সম্ভব না। প্রতিদিন মাছ ধরে সংসার চালাতাম, এখন আয়ের পথ বন্ধ।”

তিনি জানান, একটি ছোট নৌকায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার ডিজেল লাগে, কিন্তু বর্তমানে দোকানগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের জেলে রফিক দর্জি (৫০) বলেন,
“এখন নদীতে মাছও কম, তার ওপর তেল সংকট। বড় নৌকায় প্রতিদিন ২০–২৫ লিটার তেল লাগে, কিন্তু বাজারে ১–২ লিটারের বেশি পাওয়া যায় না। এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে সখিপুরের কাশিমপুর এলাকার মেসার্স ফারিয়া ফিলিং স্টেশনের পরিচালক মো. ফাহিম আহমেদ বলেন, সকল গ্রাহককে তেল দেওয়ার উদ্দেশ্যে সীমিত পরিসরে সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। কয়েকদিন তেল না থাকায় বিক্রি বন্ধ ছিল। প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী সিন্ডিকেট ঠেকাতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। তবে মানবিক বিবেচনায় কৃষক ও জেলেদের স্বল্প পরিমাণ ডিজেল দেওয়া হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, জেলেরা সাধারণত স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ডিজেল সংগ্রহ করেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সরবরাহ সংকট থাকায় তারা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না, ফলে মাছ ধরায় বিঘ্ন ঘটছে। পরিস্থিতি সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, তেল মজুদ ও সিন্ডিকেট প্রতিরোধে পাম্পগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ডিজেল বিক্রির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কোনো জেলে তেল না পেলে জেলে কার্ডের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সহায়তায় প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তেলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বালানি তেলের সংকট দ্রুত নিরসন না হলে ভেদরগঞ্জের নদীনির্ভর হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন