রক্তাক্ত স্মৃতির ক্যানভাসে বিপ্লবের দীপ্ত অঙ্গীকার, কিশোরগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

শ্রাবণের মেঘলা আকাশ আর বাতাসের স্নিগ্ধ আবেশে ঘেরা এক সকাল। কিন্তু কিশোরগঞ্জের বাতাসে আজ ভেসে বেড়াচ্ছে বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের এক পরম অনুভূতি। সারাদেশের মতো কিশোরগঞ্জেও গভীর শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য ও নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। তারুণ্যের অদম্য স্পর্ধা, গণমানুষের ঐক্য এবং শহীদদের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে স্মরণ করতে আজ গোটা জেলা যেন একাত্ম হয়েছিল একই চেতনায়।
​বুধবার (৫ অগাস্ট ) দিনগত সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক গুরুদয়াল সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সূচনা ঘটে। সকাল থেকেই স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে ভিড় জমায় হাজারো স্বজনহারা মানুষ, আহত জুলাই যোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক। নীরবতা ও কান্নার রেশ পেরিয়ে সেখানে জেগে ওঠে এক নতুন প্রত্যয়।
​শহীদদের স্মৃতিপ্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একে একে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণকালে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের দ্রত সুস্থতা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
​অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল করিম, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী ইসরাইল মিয়া, জেলা যুবদলের সভাপতি খসরুজ্জামান শরীফ, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অভি চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কিশোরগঞ্জ জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ইকরাম হোসেন ও ফয়সাল প্রিন্সসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের শীর্ষনেতৃবৃন্দ।
​সকাল ১১টায় কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত হয় এক আবেগঘন আলোচনা সভা, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সম্মেলন কক্ষের পরিবেশ তখন এক অন্যরকম আবেশে ভারাক্রান্ত। একপাশে বসে ছিলেন সেইসব মা-বাবা, যাঁরা নিজেদের প্রিয় সন্তানকে দেশের স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছেন, অন্যপাশে বসে ছিলেন দেহের কোনো না কোনো অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা কিংবা শরীরে বুলেটের ক্ষত বহন করে ঘুরে বেড়ানো অকুতোভয় তরুণরা। সংবর্ধনা প্রদানকালে শহীদ পরিবারের স্বজনদের চোখের জল ও সহযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
​অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অবিচার ও স্বৈরাচারের শেকল ভেঙে আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মহাকাব্যিক লড়াই। এই আন্দোলনে যারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন এবং যারা শরীরের রক্ত ঝরিয়ে আমাদের একটি নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন, জাতি চিরকাল তাঁদের কাছে ঋণী হয়ে থাকবে। তাঁদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।”
​পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতীত ভুলত্রুটি কাটিয়ে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, “তরুণ সমাজ দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। জুলাইয়ের এই রক্তঝরা ইতিহাস আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার শিক্ষা দেয়।”
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিতে গিয়ে নেতারা বলেন, জুলাই বিপ্লব দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে এক সুতোয় গেঁথেছে। এই আন্দোলনের মূল চেতনা—গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সব ধরনের বিভেদ ভুলে দেশ গঠনে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
​আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের একাধিক সদস্য তাঁদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর গর্বের কথা তুলে ধরেন। এক বীর শহীদের পিতা আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে আর কখনো বাবা বলে ডাকতে শুনব না। কিন্তু যখন দেখি এ দেশের তরুণেরা আজ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, দেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছে, তখন মনে হয় আমার ছেলের রক্ত বৃথা যায়নি। তবে যে স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য আমার ছেলে প্রাণ দিয়েছে, সেই স্বপ্ন যেন কোনোদিন নস্যাৎ না হয়।” ​আহত এক জুলাই যোদ্ধা মাসুদুর রহমান পল্লব তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “শরীরে এখনো বুলেটের আঘাতের যন্ত্রণা অনুভব করি, কিন্তু যখন ভাবি আমরা দেশের মানুষকে এক নতুন ভোরের মুখ দেখাতে পেরেছি, তখন সমস্ত কষ্ট এক নিমেষে মুছে যায়। এই অভ্যুত্থানের চেতনাকে আমাদের ধারণ করতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।”
​জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপন উপলক্ষে দিনব্যাপী জেলা জুড়ে আয়োজন করা হয় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি। সকালে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যার বিষয়বস্তু ছিল ‘আমার চোখে জুলাই বিপ্লব’ ও ‘স্মৃতির ক্যানভাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন’। মধ্যাহ্নে বিভিন্ন বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।
​এছাড়া দিনটি উপলক্ষে জেলা রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন যুব সংগঠনের উদ্যোগে এক স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যেখানে তরুণরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য রক্তদান করেন। বাদ জোহর জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয়ে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
​বিকেলের শেষ আলো যখন নরসুন্দা নদীর জলে ঢলে পড়ছিল, তখনও গুরুদয়াল কলেজ মাঠের স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্বলন করতে ভিড় করছিলেন সাধারণ মানুষ। জ্বলে ওঠা হাজারো মোমবাতির শিখা যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—জুলাইয়ের সেই রক্তরাঙা দিনগুলো কোনোদিন মুছে যাবে না ইতিহাস থেকে। কিশোরগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ আজ এক বাক্যে শপথ নিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পাথেয় করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন