বান্দরবান পার্বত্য জেলার জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলাগুলোর মধ্যে লামা অন্যতম। বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ উপজেলায় জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি ও নানা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি দেখা গেলেও নির্বাচনের পর লামাবাসী যথাযথ গুরুত্ব ও মূল্যায়ন পান না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লামা উপজেলার প্রতি অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের সময় বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে বিএনপির ছয়টি উপজেলার সম্মিলিত ভোটের কাছাকাছি ভোট লামা উপজেলা থেকে পাওয়ার দাবি প্রায়ই রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। তবে এ বিষয়ে নির্বাচনভিত্তিক পরিসংখ্যান যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁদের প্রশ্ন, নির্বাচনের সময় যে উপজেলাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়, নির্বাচনের পর সেই উপজেলার উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কোথায়?
জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি
লামা উপজেলায় একটি পৌরসভা, সাতটি ইউনিয়ন ও ১৮টি মৌজা রয়েছে। রাবার উৎপাদন, হর্টিকালচার, পর্যটন এবং শিল্প কর্মকাণ্ডের কারণে উপজেলাটি বান্দরবান জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেলা সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা গ্রহণে লামাবাসীকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জনসংখ্যা, ভৌগোলিক আয়তন ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে লামা উপজেলার প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। স্থানীয়দের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে লামার জনগণের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, লামার উন্নয়ন, প্রশাসনিক সমস্যা ও জনগুরুত্বপূর্ণ সংকট সরেজমিনে পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নেই। এসব বিষয়ে নিয়মিত সফর, জনশুনানি এবং জবাবদিহিমূলক পর্যালোচনা সভা আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম প্রত্যাহারে জনদুর্ভোগের আশঙ্কা,সম্প্রতি লামা উপজেলা থেকে ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম বান্দরবান জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা সদর প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় জমি ক্রয়-বিক্রয়, দলিল নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয়, সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হতে পারে।
বিশেষ করে কৃষক, ক্ষুদ্র জমির মালিক, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত বড় ধরনের ভোগান্তি সৃষ্টি করতে পারে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনিক সুবিধা ও জনস্বার্থ বিবেচনা না করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রশাসনিক আদেশ, আইনি ভিত্তি ও জনস্বার্থসংক্রান্ত মূল্যায়ন প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে লামায় স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধনসেবা পুনর্বহাল বা সহজলভ্য করার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ভূমি প্রশাসনে দীর্ঘদিনের শূন্যতা
লামা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কানুনগো পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকার অভিযোগও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, নামজারি, জমির রেকর্ড যাচাই, সরকারি জমি সংরক্ষণ এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং সেবার অগ্রগতি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রাবার ও হর্টিকালচার খাতে বিপুল কর্মসংস্থান
লামা উপজেলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি রাবার ও হর্টিকালচার খাত। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৮০০টি রাবার ও হর্টিকালচার বাগান রয়েছে এবং এসব বাগানে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া আজিজনগর এলাকায় তিনটি শিল্পকারখানা এবং সরই এলাকায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বৃহৎ কর্মযজ্ঞ রয়েছে।
এত বিপুল কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের জীবনমান এবং প্রশাসনিক সেবা উন্নয়নে আরও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় অর্থনীতির স্বার্থে শিল্পকারখানা ও বাগানভিত্তিক কর্মসংস্থান সুরক্ষা, পরিবেশসম্মত উৎপাদন এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অবৈধ ইটভাটা ও বালু উত্তোলনে পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিযোগ,লামা উপজেলায় অবৈধ ইটভাটা, পাহাড়ের মাটি কাটা এবং নদী-খাল-ঝিরি থেকে বালু উত্তোলন ও পাচার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলায় প্রায় ৩৬টি অবৈধ ইটভাটা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি মাতামুহুরি নদী, বিভিন্ন খাল ও ঝিরি এবং পাহাড়ি এলাকায় দুই শতাধিক স্থানে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কর্মকাণ্ড চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, বৈধ অনুমোদন, পাহাড় কাটার ঘটনা, বালুমহালের ইজারা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগ আইন অনুযায়ী পরীক্ষা করা জরুরি।
অবৈধভাবে পাহাড়ের মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন চলতে থাকলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, বনাঞ্চল, নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ, কৃষিজমি এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ধুলাবালি ও শব্দদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি হলেও কার্যকর প্রতিকার দৃশ্যমান নয়। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা বা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।
প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন,বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী এম. রুহুল আমিন অভিযোগ করে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে লামায় অবৈধ ইটভাটা, পাহাড় কাটা এবং বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠে আসছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশ ধ্বংস, সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন, অবৈধ বালু ব্যবসা কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে দল-মত ও প্রভাব বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে এবং নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা যাবে না।”
তিনি প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, লামার প্রশাসনিক সেবা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও পরিবেশ সুরক্ষার সংকট সমাধানে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারের প্রতি দাবি লামাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও জনস্বার্থ বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হচ্ছে—
১. ভূমি নিবন্ধনসেবা: লামা থেকে ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য সহজলভ্য নিবন্ধনসেবা নিশ্চিত করা।
২.শূন্য পদ পূরণ: সহকারী কমিশনার (ভূমি), কানুনগোসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দ্রুত কর্মকর্তা নিয়োগ ও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা।
৩.ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব: বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে লামার জনসংখ্যা ও স্বার্থের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা।
৪.অবৈধ ইটভাটা তদন্ত: অভিযোগে উল্লিখিত ইটভাটাগুলোর অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনগত বৈধতা যাচাই করে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
৫.পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন বন্ধ: অভিযোগে উল্লিখিত স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন, অবৈধ উত্তোলন বন্ধ, দায়ীদের শনাক্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রম পর্যালোচনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
৭. জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামো সুরক্ষা: ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, নদী-খাল, বনাঞ্চল ও জনবসতি রক্ষায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।
৮.রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন: নির্বাচনের সময় দেওয়া উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি প্রকাশ এবং লামার সমস্যা নিয়ে নিয়মিত জনশুনানি আয়োজন করা।
লামা শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি বান্দরবান জেলার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, কর্মসংস্থানের কেন্দ্র এবং রাবার, হর্টিকালচার ও পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। অথচ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ভূমি প্রশাসন, নাগরিক সেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে একের পর এক অভিযোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।
নির্বাচনের সময় জনগণের সমর্থন চাওয়া এবং নির্বাচনের পরে তাঁদের সমস্যা উপেক্ষা করা কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। লামাবাসীর প্রত্যাশা—তাঁদের ভোট, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক অবদান ও পরিবেশগত নিরাপত্তার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে লামাকে অবহেলিত জনপদের পরিচয় থেকে বের করে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও উন্নয়নমুখী উপজেলায় পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।