সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি হোস্টেলের সামনে ‘কিডনি বিক্রির’ পোস্টার, উঠছে নানা প্রশ্ন

 রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি হোস্টেলের সামনে ‘কিডনি বিক্রি’র বিজ্ঞাপন সম্বলিত একটি পোস্টার ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন পোস্টার প্রকাশ্যে সাঁটানোয় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি ইন্টার্নি হোস্টেলের সামনের দেয়ালে সাঁটানো একটি পোস্টারে লেখা দেখা যায়— “জরুরি প্রয়োজনে একটি কিডনি বিক্রি করা হবে।” পোস্টারে রক্তের গ্রুপ B+ উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বরও দেওয়া রয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি পোস্টার লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর আড়ালে কোনো ব্যক্তির চরম আর্থিক সংকট, অসহায়ত্ব কিংবা সংঘবদ্ধ কোনো চক্রের কার্যক্রম রয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ পুরান ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজটির সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে।  এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলের সামনে প্রকাশ্যে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যাওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
‘জরুরি প্রয়োজনে কিডনি বিক্রি’—কী বোঝাতে চায় পোস্টারটি?
পোস্টারে ব্যবহৃত ‘জরুরি প্রয়োজনে’ শব্দটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রশ্ন উঠছে—কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই আর্থিক সংকটের কারণে নিজের কিডনি বিক্রির কথা ভাবেন, তাহলে তার আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হলে এমন সিদ্ধান্তের কথা মাথায় আসতে পারে?
আবার অন্যদিকে, পোস্টারটি সত্যিকার কোনো কিডনি বিক্রির বিজ্ঞাপন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ মানবদেহের অঙ্গ বিক্রির নামে প্রতারণা, দালালচক্র বা অবৈধ লেনদেনের চেষ্টা থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই শুধু পোস্টারটি দেখে সিদ্ধান্তে না গিয়ে এর পেছনের ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এবং পুরো বিষয়টি যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতনরা।
মেডিকেল কলেজের সামনে কেন?
আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো—মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি হোস্টেলের মতো জায়গায় এই পোস্টার কীভাবে লাগানো হলো?
হোস্টেল এলাকায় নিয়মিত শিক্ষার্থী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন মানুষের চলাচল রয়েছে। সেখানে একটি পোস্টার লাগিয়ে দীর্ঘ সময় তা দৃশ্যমান থাকলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা। ফলে পোস্টারটি কে লাগিয়েছে, কখন লাগানো হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আর্থিক সংকট, নাকি অন্য কোনো চক্র?
সচেতন মহলের মতে, যদি সত্যিই কোনো ব্যক্তি নিজের কিডনি বিক্রির কথা বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়—মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
একজন মানুষ কেন নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ বিক্রির কথা ভাবছেন—তার পেছনে ঋণের চাপ, দারিদ্র্য, চিকিৎসার খরচ, পারিবারিক সংকট কিংবা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা দরকার।
অন্যদিকে, যদি পোস্টারটি কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের প্রচারণা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ অসহায় মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মানব অঙ্গের অবৈধ লেনদেনে জড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি
এ ঘটনায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
প্রথমে পোস্টারে দেওয়া মোবাইল নম্বরটির বিষয়ে যাচাই করা, পোস্টারটি কারা লাগিয়েছে তা শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত ঘটনা জানা যেতে পারে। প্রয়োজনে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেও পোস্টার লাগানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে পোস্টারটি সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি এমন বিজ্ঞাপন ভবিষ্যতে যাতে হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজের আশপাশে লাগানো না হয়, সেদিকেও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
‘মানুষ কতটা অসহায় হলে…’
মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। সেই কিডনি বিক্রির কথা উল্লেখ করে প্রকাশ্যে পোস্টার লাগানোর ঘটনা শুধু বিস্ময়ের নয়, সমাজের বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
অর্থের অভাবে একজন মানুষ যদি নিজের শরীরের অঙ্গ বিক্রির কথা চিন্তা করেন, তাহলে তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের। আর যদি এর পেছনে কোনো অসাধু চক্র থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
তবে পোস্টারে দেওয়া তথ্যের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে গুজব না ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি হোস্টেলের সামনে ‘কিডনি বিক্রির’ এই পোস্টার শেষ পর্যন্ত কার, কেনই বা লাগানো হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে ঘটনাটি সামনে এনে দিয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—মানুষ কতটা অসহায় হলে নিজের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রির কথা ভাবতে বাধ্য হয়?

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন