ইতিহাসের পাতায় কিছু দিন আসে যা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এক একটি পৈশাচিক অধ্যায় আর ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। ১১ মে তেমনই একটি দিন। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে ১৯৮৫ সালের এই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঈদগাহ ময়দানে রচিত হয়েছিল এক কলঙ্কিত ইতিহাস। পবিত্র কুরআনের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দিয়েছিলেন আটজন কোরআনপ্রেমী মানুষ। সেই থেকে এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে ‘কোরআন দিবস’ হিসেবে পরিচিত।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল সীমান্ত ছাড়িয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ১২ এপ্রিল ১৯৮৫, পদ্মপল চোপরা ও শীতল সিং নামে দুই উগ্রবাদী ব্যক্তি কলকাতা হাইকোর্টে পবিত্র কুরআন বাজেয়াপ্ত করার জন্য একটি রিট আবেদন করেন। তাদের দাবি ছিল—কুরআনের কিছু আয়াত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতে পারে। বিচারপতি পদ্মা খাস্তগীর এই ধৃষ্টতাপূর্ণ মামলাটি গ্রহণ করলে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। ঢাকার বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু করে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া—সবখানেই মুমিন মুসলমানরা রাজপথে নেমে আসেন।
১১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ। কিন্তু তৎকালীন প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে। সমাবেশ স্থলের পরিস্থিতি ছিল থমথমে। সমাবেশের আহ্বায়ক মাওলানা হোসাইন আহমদকে এসপি অফিসে ডেকে চাপ দেওয়া হয় কর্মসূচি বাতিলের জন্য। জনতা যখন ঈদগাহে সমবেত হচ্ছিল, তখন নেতৃবৃন্দ কেবল মোনাজাত করে চলে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা সেই নূন্যতম সুযোগটুকু না দিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুরু করেন।
এক পর্যায়ে বিনা উস্কানিতে পুলিশের গুলিবর্ষণে মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয় ঈদগাহের পবিত্র মাটি। পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন:
আব্দুল মতিন (দশম শ্রেণির ছাত্র)
রশিদুল হক
সেলিম (অষ্টম শ্রেণির ছাত্র)
শাহাবুদ্দীন
আলতাফুর রহমান সবুর
মোক্তার হোসেন
নজরুল ইসলাম
শীষ মোহাম্মদ
হাসপাতালে নেয়ার পথেও আহতদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। সেই দিনের সেই আর্তনাদ আজও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়।
সত্যের বিজয় ও কুরআনের অপরাজেয়তা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের মুখে ভারত সরকার তটস্থ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৩ মে ১৯৮৫ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বিসি বাসক মামলাটি খারিজ করে দেন। পবিত্র কুরআনের এই বিজয় আবারও প্রমাণ করে যে, এই মহান গ্রন্থের রক্ষক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। সূরা ইউনুসে আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন—মানুষ বা জিন জাতি মিলেও এই কুরআনের একটি সূরার মতো কিছু তৈরি করতে পারবে না।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পার হয়ে গেলেও সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। বরং মূল অভিযুক্তরা রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন হয়েছেন। এমনকি জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েও অনেকে শাস্তি এড়িয়ে গেছেন। পার্থিব আদালতে বিচার না পেলেও শহীদদের স্বজনরা আজ তাকিয়ে আছেন মহান রবের ইনসাফের দিকে।
১১ মে আমাদের শিখিয়ে দেয়, ঈমানের দাবি যখন আসে তখন মুমিনরা জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শহীদরা আমাদের চেতনার বাতিঘর। প্রতিবছর যখন এই দিনটি ফিরে আসে, তখন এটি কেবল শোকের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় আপসহীন থাকার শপথ মনে করিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
”উহারা কি দাবি করে যে কুরআন আপনার বানানো? তোমরা যদি তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হও তাহলে একটি সূরা অন্তত তৈরি করে নিয়ে এসো।” — (সূরা ইউনুস : ৩৮)




