৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র ১১ জন অষ্টগ্রামে জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা, বন্ধ সিজারিয়ান

হাসপাতালে শয্যা আছে, ভবন আছে, চিকিৎসা সরঞ্জামও রয়েছে—কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স নেই। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন পরিস্থিতিই বিরাজ করছে। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে অনুমোদিত ৩৫টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। ফলে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের। ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা।
হাওরবেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসার প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৩৫টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে ২৪টিই বর্তমানে শূন্য। কর্মরত ১১ জন চিকিৎসককে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ভর্তি রোগী এবং অন্যান্য চিকিৎসাসেবা সামলাতে হচ্ছে। শূন্য পদগুলোর মধ্যে ১১টি কনসালটেন্ট এবং একটি আবাসিক মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) পদ রয়েছে।
চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সের সংকটও প্রকট। ৩০টি অনুমোদিত নার্সিং পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১ জন। রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা কম হওয়ায় দায়িত্ব পালনরত নার্সদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে। বিশেষ করে ভর্তি রোগীদের সার্বক্ষণিক সেবা দিতে গিয়ে তাদের নিয়মিত দায়িত্ব সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রসূতি ও অস্ত্রোপচার সেবায়। হাসপাতালটিতে আগে সিজারিয়ান অপারেশন করা হলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় গাইনি সার্জন ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় এ সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রসূতি রোগীদের জটিল অবস্থায় অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাইরে পড়ে আছে।
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগেও রয়েছে জনবল ঘাটতি। ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ফার্মেসি ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় সেবার পরিধি সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৩ সালে অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে শয্যা বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে কাগজে-কলমে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে চিকিৎসাসেবার সুযোগ সে অনুপাতে বাড়েনি।
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ বলেন, “হাসপাতালের তীব্র জনবল সংকট এবং চিকিৎসকদের আবাসন সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।”
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাইদুর রহমান বলেন, “চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের জনবল নিয়োগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল সংকটের বিষয়টি নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।”
হাওরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসার একটি প্রতিষ্ঠান হয়েও অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমন জনবল সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধ থাকা সিজারিয়ান সেবা চালু এবং অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের মতে, শুধু ৫০ শয্যার অবকাঠামো থাকলেই হবে না, সেই অবকাঠামোর উপযোগী চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত করলেই কেবল এলাকার মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন