
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পদদলনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ, জরুরি সময়ে রোগী সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং একটি সিঁড়ি বন্ধ থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে রোগী ও স্বজনরা দ্রুত ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে পদদলনের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সময়ে মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে ছয়জনের মৃত্যুর খবর প্রচার হলেও পরবর্তীতে পদদলনে চারজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে আসে।
এদিকে মৃতের তালিকায় একজন জীবিত ব্যক্তির নাম থাকার বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি জীবিত থাকলেও তাঁর ভগ্নিপতি মারা গেছেন বলে স্বজনরা জানান।
হাসপাতালের জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে বের করে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও কার্যকর প্রটোকল ছিল কি না—এখন সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনে দুটি সিঁড়ির একটি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের একটি সিঁড়ি ব্যবহার করে নিচে নামতে হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক সময় ট্রলিতেও রোগী রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায় না বলে স্বজনদের অভিযোগ।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে তারাকান্দার এক বাসিন্দার স্বজন জানান, ক্যান্সারে আক্রান্ত ওই রোগীকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে নেওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রলিতে থাকতে হয়েছিল। জায়গার সংকটের কারণে তাকে ট্রলি থেকে নামানো সম্ভব হয়নি। পরে ওই রাতেই তিনি মারা যান।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তারের ঘটনাটিও হৃদয়বিদারক। ৩৫ বছর বয়সী কুলসুম আক্তার প্রায় ১২ দিন ধরে জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন।
স্বজনদের দাবি, আগুনের সময় সন্তানকে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করার সময় কুলসুম আক্তার পদদলনের শিকার হন। তবে তিনি তাঁর অসুস্থ সন্তানকে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হন।
এ ঘটনায় হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, বন্ধ থাকা সিঁড়ি এবং রোগী-স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, জরুরি মুহূর্তে একটি সিঁড়ি কেন বন্ধ ছিল, ভবনটিতে পর্যাপ্ত বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল কি না এবং পদদলনের পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হলো—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না তা নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দেওয়ারও দাবি উঠেছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই হাসপাতালের রোগীর চাপ মোকাবিলা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নিরাপদে রোগী সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





