গাইবান্ধায় আখ চাষে স্বাবলম্বী কৃষক, সাথী ফসলে বাড়তি আয়

গাইবান্ধায় আখ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কৃষকরা। আখের পাশাপাশি একই জমিতে সাথী ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করছেন তাঁরা। এতে একদিকে কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে, অন্যদিকে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আখ চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাজ করছে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএসআরআই) গাইবান্ধা উপকেন্দ্র। তবে প্রতিষ্ঠানটির মোট ১১টি পদের মধ্যে পাঁচটি পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
আখের সঙ্গে সাথী ফসল, বাড়ছে কৃষকের আয়
সরেজমিনে দেখা যায়, আখের জমিতে সারিবদ্ধভাবে বেড়ে উঠছে সবুজ আখগাছ। জমির ফাঁকা জায়গায় আখের পাশাপাশি সাথী ফসল চাষ করছেন কৃষকরা। ফলে আখ বিক্রির আয়ের পাশাপাশি সাথী ফসল থেকেও অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা।
স্থানীয় আখচাষি সাজু ও আতিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আখ চাষ তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একই জমিতে সাথী ফসল উৎপাদন করায় বাড়তি আয় হচ্ছে। তাঁদের মতে, পরিকল্পিতভাবে আখ চাষ এবং জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আর্থিক লাভের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
কৃষকদের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ প্রদান এবং আখের পাশাপাশি উপযোগী সাথী ফসল চাষে উৎসাহিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নয় ধরনের সুগারক্রপ নিয়ে কাজ করছে বিএসআরআই
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গাইবান্ধা উপকেন্দ্র আখসহ বিভিন্ন ধরনের সুগারক্রপের গবেষণা, উন্নয়ন ও চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সুগারক্রপ চাষের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইনচার্জ জাহিদ হাসান শুভ বলেন, “আমরা এখান থেকে নয়টি সুগারক্রপ নিয়ে কাজ করছি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তালগাছ ও আখ। সুগারক্রপের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি জানান, সুগারক্রপের বৈচিত্র্য, উৎপাদন এবং ব্যবহার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি কৃষি খাতে এসব ফসলের সম্ভাবনা তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা উপকৃত হতে পারেন।
সুগারক্রপ বলতে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় উপাদান উৎপাদন কিংবা আহরণের উপযোগী ফসলকে বোঝায়। আখ এ ধরনের ফসলের অন্যতম। তালগাছ থেকেও রস সংগ্রহ করা হয়, যা থেকে গুড়সহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়।
অন্যদিকে, ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যাভ্যাস ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন ফসলের উপাদান ও ব্যবহার নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। তবে কোনো ফসল বা সুগারক্রপজাত পণ্যকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কিংবা রক্তে শর্করা কমানোর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার আগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
১১টি পদের মধ্যে শূন্য পাঁচটি
বিএসআরআইয়ের গাইবান্ধা উপকেন্দ্রের জনবল পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন পদে কর্মরত রয়েছেন ছয়জন। বিপরীতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ, মোট ১১টি পদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ পদই শূন্য।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইনচার্জ ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে যোগদান করেন। সীমিত জনবল নিয়ে উপকেন্দ্রটির গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে গবেষণা পরিচালনা, উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ প্রদান এবং উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকলে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় শূন্যপদ পূরণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে উপকেন্দ্রটির কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আখ চাষে সম্ভাবনা, প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সহায়তা
গাইবান্ধার কৃষিতে আখ চাষের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উন্নত জাতের ব্যবহার, সঠিক সময়ে রোপণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং জমির উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আখের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাথী ফসল নির্বাচন করতে হবে, যাতে মূল ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত না হয়।
কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো, ফলন বাড়ানো এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আখ চাষের পাশাপাশি সাথী ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা জমি থেকে বাড়তি আয় করতে পারলে এ চাষে তাঁদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
এ জন্য বিএসআরআইয়ের গাইবান্ধা উপকেন্দ্রের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, গাইবান্ধায় আখ চাষের পাশাপাশি সাথী ফসল উৎপাদন কৃষকদের আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এ সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে গবেষণা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা এবং উপকেন্দ্রের শূন্যপদ পূরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন