একসময় যেখানে কৃষকের কণ্ঠে ভেসে আসত দরদামের ডাক, যেখানে চালের ঘ্রাণে মুখর থাকত চারপাশ—সেই রায়বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘চাল মহল’ আজ পরিণত হয়েছে অবহেলা, দখলদারিত্ব আর নোংরামির এক নিঃশব্দ স্থানে। ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থানটি এখন অনেকের কাছে শুধুই একটি উন্মুক্ত প্রসাবখানা।
ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রায়বাজারের এই চাল মহল একসময় ছিল স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রাণকেন্দ্র। গ্রামের কৃষকরা অল্প পরিমাণ চাল নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসতেন, ক্রেতারা দরকষাকষি করে চাল কিনতেন—এ যেন ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির এক জীবন্ত চিত্র। এই লেনদেন থেকে রাষ্ট্রও পেত রাজস্ব। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিক্রমায় সেই দৃশ্য আজ শুধুই স্মৃতি।
এই প্রতিবেদকের সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে সেখানে আর কোনো কৃষক বসেন না, নেই ক্রেতাদের আনাগোনা। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, ভেঙে পড়ছে স্থাপনার কাঠামো। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়—স্থানটি এখন নিয়মিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে উন্মুক্ত প্রসাবখানা হিসেবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে জায়গাটি দখলদারদের কবলে পড়ে আছে। কেউ গড়ে তুলেছে অস্থায়ী দোকান, কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করছে স্থানটি। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
চাল বিক্রি করতে আসা এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “এই চাল মহল ছিল আমাদের গর্ব। এখানে দাঁড়িয়ে আমরা ইতিহাসের গন্ধ পেতাম। এখন সেখানে দাঁড়াতে লজ্জা লাগে—গন্ধে, দৃশ্যে, অবহেলায়।” একজন তরুণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ছোটবেলায় বাপ-দাদাদের মুখে এই চাল মহলের গল্প শুনেছি। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখি সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র—এ যেন ইতিহাসের সঙ্গে এক নির্মম প্রতারণা।”
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত দখলমুক্ত করে যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে রায়বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি অচিরেই ইতিহাসের পাতা থেকেও মুছে যাবে। আজ ‘চাল মহল’ শুধু একটি ভগ্ন স্থাপনা নয়—এটি আমাদের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির এক জীবন্ত প্রতীক।
প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি আমাদের ঐতিহ্যকে এভাবেই ধ্বংস হতে দেব?




