গতকাল হঠাৎ বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে উপকূলীয় পেকুয়া ও দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ। মঙ্গলবার (ভোররাত) আকস্মিক ঝড় ও বৃষ্টিতে মাঠভর্তি উৎপাদিত ও উৎপাদনাধীন লবণ পানিতে মিশে যাওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পেকুয়া উপজেলার মগনামা, রাজাখালী উজানটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চাষিরা হতাশ দৃষ্টিতে প্লাস্টিক মোড়ানো লবণ মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাতের বৃষ্টিতে জমাট বাঁধা সাদা সোনা খ্যাত লবণ গলে পানিতে মিশে গেছে। পাশাপাশি লবণ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড’ বা কাই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মগনামা শরৎঘোনা এলাকার লবণচাষী আবু আহমেদ বলেন,লবণ মৌসুমের শেষ সময়ে একটু বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেল, এখন আবার নতুন করে মাঠ তৈরি করতে হবে, যা অনেক ব্যয়বহুল।
উজানটিয়া করিয়ারদ্বিয়া এলাকার লবণচাষী শাহ আলম বলেন, বাজারে লবণের দাম এমনিতেই কম। তার ওপর এই ঝড়ে সব শেষ হয়ে গেল ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, এখন কীভাবে তা শোধ করব বুঝতে পারছি না।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫–২৬ মৌসুমে দেশে লবণের জাতীয় চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় প্রায় ৬৯ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজারের বেশি চাষি লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন।
পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা, উজানটিয়া ও সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার ৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হয়। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এখান থেকে গড়ে ২.৫ থেকে ৩.৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়।
বিসিকের প্রাথমিক তথ্যমতে, সাম্প্রতিক এই বৃষ্টিতে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া অঞ্চলের কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠের লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে চাষিদের অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় করতে হবে। এতে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় চাষিরা জানান, উৎপাদন খরচ যেখানে প্রতি মণ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকার বেশি, সেখানে বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় তারা আগে থেকেই লোকসানে ছিলেন। এর মধ্যে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মাঠ ইজারা নিয়েছেন, ফলে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাষিরা দ্রুত ক্ষতি পূরণ ও প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন।




