সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস: জৈন্তিয়া রাজ্যের ২২৯ বছরের পুরোনো সরাইখানা ঝুঁকিতে

সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক দিয়ে চলাচলের সময় ঢুপির পাহাড়ের পাদদেশে হঠাৎই চোখে পড়ে একটি প্রাচীন দোচালা স্থাপনা। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘরটি শুধু কৌতূহল জাগায় না, বরং বহন করে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসের স্মৃতি।

ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯৭ সালে জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ এই সরাইখানা বা পান্থশালাটি নির্মাণ করেন। সে সময় এটি ছিল ভ্রমণকারী, ব্যবসায়ী ও পুণ্যার্থীদের বিশ্রামের অন্যতম কেন্দ্র।

নৌ-বন্দর থেকে রাজধানীর পথে যাত্রাবিরতি

একসময় ঢুপি গ্রামের সারীঘাট ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের ব্যস্ততম নৌ-বন্দরগুলোর একটি। দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে মানুষ নৌপথে এসে এখানে নামতেন। এরপর রাজধানীর উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে এই সরাইখানায় বিশ্রাম নিতেন।

দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের জন্য এটি ছিল নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে মিলত বিশ্রাম ও আহারের সুযোগ। ফলে সরাইখানাটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং তৎকালীন যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

স্থাপত্যে প্রাচীন কারুকাজের নিদর্শন

দোচালা নকশার এই স্থাপনাটির সামনে রয়েছে পাঁচটি খিলানবিশিষ্ট বারান্দা। দেয়ালের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং পুরু গাঁথুনি প্রমাণ করে তৎকালীন নির্মাণশৈলীর দৃঢ়তা ও নান্দনিকতা।

১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও এই স্থাপনাটি টিকে ছিল প্রায় অক্ষত অবস্থায়, যা এর নির্মাণমানের শক্তিমত্তার প্রমাণ। তবে ব্রিটিশ আমলে সিলেট-শিলং সড়ক নির্মাণের সময় সরাইখানার সঙ্গে থাকা পাথরে বাঁধানো জলাধারটি ভরাট করে দেওয়া হয়।

সড়কের মাঝখানে বিপন্ন ঐতিহ্য

বর্তমানে এই সরাইখানাটি সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের দুই লেনের মাঝখানে অবস্থান করছে। প্রতিদিন দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহন এর পাশ দিয়ে চলাচল করছে।

স্থানীয়দের মতে, যানবাহনের কম্পন, ধুলোবালি ও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষক সৈয়দ ইকবাল হোসাইনের বক্তব্য

জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পশ্চিম ঠাকুরের মাটি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক সৈয়দ ইকবাল হোসাইন বলেন,

“এই সরাইখানাটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ছোটবেলা থেকেই আমরা এটিকে এভাবেই দেখে আসছি। কিন্তু এখন এর চারপাশের পরিবেশ ও সড়কের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, এটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রতিদিন ভারী যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করছে, যার কম্পনে স্থাপনাটির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া কোনো ধরনের সুরক্ষা বেষ্টনী না থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সরকার যদি দ্রুত সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হারাতে পারি।”

সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপের দাবি

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এই স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত সংরক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুরক্ষা বেষ্টনী নির্মাণ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প সড়ক পরিকল্পনার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।

পর্যটনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল

যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা গেলে এই সরাইখানাটি সিলেটের অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। জাফলং, বিছনাকান্দি ও লালাখালের মতো পর্যটন স্পটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করবে।

শেষ কথা

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সরাইখানা আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। কিন্তু অবহেলা ও ঝুঁকির মধ্যে থাকলে যেকোনো সময় হারিয়ে যেতে পারে এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদ।

এখনই সময়—সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন