মঙ্গলবার,২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দ্রব্যমূল্য দৌড়াচ্ছে, সরকার দৌড়াবে কবে

বিএনপি সরকার গঠনের পর এরই মধ্যে ষাট দিন পার হয়েছে। সফলতা বা ব্যর্থতা খোঁজার জন্য এটা লম্বা সময় নয়। বলা বাহুল্য, এ সময়ে সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকের হাতে পৌঁছে গেছে কৃষি কার্ড। নারীরাও পেয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। দেশের বিভিন্ন স্থানে খাল খননও শুরু হয়েছে। আর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানো, কয়েকটি খাতে দুর্নীতি দমন কার্যক্রম জোরদার করা এবং দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টাও আমাদের আশাবাদী করছে।

তবে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সেটাতেই ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজারে গেলেই বোঝা যায়—যে টাকায় আগে এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে দুদিনও চলা দায়। যদিও মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্য কমার কথা বললেও বাজারের চিত্র উল্টো। বরাবরই সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির তথ্য নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করে থাকেন।

চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস—প্রতিটি পণ্যের দাম যেন লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ঊর্ধ্বগতির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। একদিকে আয় স্থির, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। নিম্নবিত্তের অবস্থা আরও করুণ; তাদের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় সরকারের ‘নরম’ অবস্থান বর্তমানে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে—সরকার কি বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব দিচ্ছে? এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে; যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের সরকারগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে লোক-দেখানো কিছু উদ্যোগ নিতে। এসব ক্ষেত্রে বরাবরই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে। অনেক সময় পণ্যের দাম বেঁধেও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো সময়ই বাঁধা দামে ‘পণ্য বাধা’ পড়েনি। এসব যেন ছিল জনগণের সঙ্গে রসিকতা!

বর্তমানে সবজির দাম আকাশছোঁয়া—যা আগে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সহজলভ্য ছিল, এখন তা বিলাসদ্রব্যের মতো মনে হচ্ছে। বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। মাছ ও মুরগির বাজারেও একই চিত্র। ব্রয়লার মুরগির দাম রোজার শেষ দিকে বাড়ার পর আর কমেনি। চাল, ডাল, তেল—এসব মৌলিক পণ্যের দামও স্থিতিশীল নয়। বাজারে গেলেই ফাঁকা হচ্ছে পকেট।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা—এসব বড় ভূমিকা রাখে। তবে এর পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেট ও অস্বচ্ছতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে পণ্যের দাম বেড়ে যায়; যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে। নিম্নবিত্ত শ্রেণি আগে থেকেই টিকে থাকার লড়াইয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু মধ্যবিত্তের আয় সীমিত অথচ ব্যয় বহুমুখী। তাদের জন্য এ মূল্যস্ফীতি এক ধরনের নীরব সংকট তৈরি করেছে। সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসাভাড়া—সবকিছু মিলিয়ে তারা এক ধরনের অর্থনৈতিক চাপে আছে। সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে পাশাপাশি বাড়ছে মানসিক চাপ। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দিনমজুর শ্রেণি। তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে খাবারের পরিমাণ কমাতে বা কম পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত হতে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য ও জীবনের মানের ওপর।

সরকার কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো এবং কৃষি খাতে প্রণোদনা বাড়ানো। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল দিতে পারে। কিন্তু বাজারে এর তাৎক্ষণিক প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এর একটি বড় কারণ হলো, বাস্তবায়নের দুর্বলতা। নীতিনির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—এ দুইয়ের মধ্যে ফাঁক রয়ে গেছে। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো বাজারে কার্যকর হতে সময় নিচ্ছে বা অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো স্পষ্ট। নিয়মিত অভিযান, মূল্য তালিকা যাচাই, কিংবা মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা—এসব কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয় বা বলা চলে অধারাবাহিক। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এখনো শক্তিশালী। তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে। সরকারি নজরদারি দুর্বল হওয়ায় এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে:

ত্রুটিপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা: উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কয়েক হাত ঘুরে পণ্য পৌঁছায়। অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী থাকার কারণে পণ্যের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যায়।

মজুতদারি ও সিন্ডিকেট: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত ফায়দা লুটে নিচ্ছে।

আমদানিনির্ভরতা: অনেক পণ্যে বিদেশ নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ওঠানামার প্রভাব পড়ছে।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানি খরচ ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতায় দাম বাড়ছে।

তথ্য ঘাটতি: বাজারে স্বচ্ছ তথ্যের অভাব ভোক্তাদের অসহায় করে তুলছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কিছু জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

শক্তিশালী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা: নিয়মিত ও কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে।

সিন্ডিকেট ভাঙতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন: মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজন হলে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না।

সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ: দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে কখনো দলীয় পরিচয়ে, কখনো পরিবহন মালিক সমিতির নামে চাঁদাবাজি করা হয়। ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে গিয়ে পরিবহন খরচ বাড়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যে দামে। পরিবহন খাত চাঁদা মুক্ত করার বিকল্প নেই।

সরাসরি কৃষক থেকে পণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। মনোযোগী হতে হবে আমদানি নীতি সহজ ও দ্রুত বাস্তবায়নে। সম্প্রসারণ করতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।

সরকারের সাফল্য কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তে নয় বরং সে সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের অন্যান্য অর্জনও ম্লান হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা—এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারের নীতি ও পদক্ষেপ নির্ধারণ করা উচিত। তাহলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে এবং দেশে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।

একটা কৌতুক দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। ডিমের দাম বাড়ানো নিয়ে মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈঠক চলছে। বৈঠকে একজন ব্যবসায়ী নেতা বললেন, ‘বর্তমান বাজারে প্রতি পিস ডিমের দাম ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা করা দরকার, না হলে আমাদের লাভ থাকে না।’ এ কথা শুনে মন্ত্রী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘মাত্র দুই টাকা বাড়ানোর কথা বলছ? না, তা হবে না। আমি নির্দেশ দিচ্ছি, দাম চার টাকা করে বাড়াতে হবে।’ ব্যবসায়ীরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকায়—‘মন্ত্রী মহোদয় কী বলছেন!’ তখন মন্ত্রী একটু হেসে বললেন, ‘আরে, ভোক্তাদের কথাও তো আমার মাথায় রাখতে হয়। তোমরা চার টাকা করে বাড়ানোর পর আমি দুই টাকা করে কমিয়ে দেব। এতে ভোক্তারাও খুশি থাকবে, আর তোমরাও লাভে থাকবে। শুধু আমার ভাগেরটা…।’

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন