অরক্ষিত ব্যস্ত ফেরিঘাটে ঝুঁকিতে হাজারো প্রাণ

প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। বাসের জানালা দিয়ে পদ্মার বিশাল জলরাশির দিকে তাকিয়ে কেউ হয়তো ভাবেন প্রিয়জনের হাসিমাখা মুখের কথা, কেউবা ক্লান্ত শরীরে ঢলে পড়েন ঘুমের ঘোরে। কিন্তু এরই মধ্যে পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের নিচে ওতপেতে থাকে মৃত্যু আতঙ্ক। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন পার হয় হাজারো যানবাহন ও লাখো প্রাণ। অথচ দেশের অন্যতম এই ব্যস্ত নৌরুটে দুর্ঘটনার পর জীবন বাঁচানোর জন্য নেই কোনো স্থায়ী ডুবুরি দল। ফলে প্রতিটি দুর্ঘটনায় সময়ের ব্যবধানে ফিকে হয়ে আসে বাঁচার আশা, আর দীর্ঘ হয় লাশের মিছিল।

দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন কয়েক হাজার পণ্যবাহী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস এই রুট ব্যবহার করে। নদী ঘিরে গড়ে ওঠা এই জনপদে পদ্মার ভাঙন আর স্রোতের তীব্রতা চিরচেনা। ফেরিতে উঠতে গিয়ে গাড়ি নদীতে পড়ে যাওয়া বা লঞ্চ দুর্ঘটনার খবর এখানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে চারটিই নদীবেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও এই জনপদে কোনো স্থায়ী উদ্ধারকারী ডুবুরি ইউনিট নেই। এই অভাব যেন এক নীরব মরণফাঁদ। নদীপথ এখানে শুধু যোগাযোগ নয়, জীবনযাত্রার অংশ। কিন্তু নদীপথে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও নেই পর্যাপ্ত উদ্ধার ব্যবস্থা।

বিশেষ করে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ফেরিতে উঠতে গিয়ে যানবাহন নদীতে পড়ে যাওয়া, লঞ্চ দুর্ঘটনা কিংবা নৌযানের সংঘর্ষ—এসব ঘটনা এখানে নতুন নয়। অথচ এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রথম কয়েক মিনিট বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দৌলতদিয়ায় কোনো অঘটন ঘটলে উদ্ধারকারীদের জন্য চেয়ে থাকতে হয় ঢাকা বা পার্শ্ববর্তী দূরবর্তী ইউনিটের দিকে। স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলি। দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারের লোক আসতে আসতেই সব শেষ হয়ে যায়। চোখের সামনে মানুষ তলিয়ে যেতে দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার থাকে না।’একই সুর সংবাদকর্মী খোন্দকার সুজনের কণ্ঠে। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বললেন, ‘উদ্ধার অভিযানে বিলম্বের কারণে আমরা কেবল লাশের সংবাদ লিখি। যদি এখানে স্থায়ী ডুবুরি দল থাকত, তবে সংবাদে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে বেঁচে ফেরার গল্পই বেশি থাকত।’

ব্যস্ততম এই ফেরিঘাট দিয়ে প্রায়ই যাতায়াত করা যাত্রী আল-আমিন বলেন, ‘যখনই এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করি, তখই নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তা থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার না হলে জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে স্থায়ী ডুবুরি দল থাকা খুবই প্রয়োজন।’

এই ফেরিঘাটের নিরাপত্তাহীনতা শুধু সাধারণ যাত্রী নয়, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মনেও ভীতি ছড়িয়েছে। দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক গায়েন জুয়েল রানা বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী এই ঘাট ব্যবহার করে। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময় শঙ্কিত।’

অন্যদিকে ব্যবসায়ী কুব্বাত সরদার জানান, পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে পারাপারের সময় জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকেন।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারাও। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করতে এখানে একটি স্থায়ী ডুবুরি দল স্থাপন এখন সময়ের দাবি। এতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে এবং প্রাণহানি কমানো যাবে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডুবুরি দলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দুর্ঘটনা-পরবর্তী শোক প্রকাশ কোনো সমাধান নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জীবনরেখায় আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ডুবুরি ইউনিট থাকা আবশ্যক। প্রযুক্তিগত নজরদারি আর জরুরি সাড়াদানের ব্যবস্থা থাকলে পদ্মা আর ‘জমদূত’ হয়ে উঠবে না।

অবশ্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (সংসদ সদস্য) সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এ প্রসঙ্গে আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে স্থায়ী ডুবুরি দল মোতায়েন এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং লাখো মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। এই দাবি পূরণ হলে হয়তো আগামীতে পদ্মার পাড়ে স্বজন হারানো কান্নার বদলে স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা যাবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন