ঝিনাইদহে বাসে অগ্নিসংযোগ ও তেল পাম্পে ভাঙচুরের অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৭ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রোববার মধ্যরাতে তাদেরকে পৃথক দুটি মামলায় আটক করা হয়। পরে সোমবার দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। এদিকে মধ্যরাত থেকে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে বলে আসামিরা দাবি করেছেন। প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় চিৎকার তারা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। একই সাথে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও জোর দাবি করেন।
এর আগে সোমবার (৯ মার্চ) রাত ২টার দিকে শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন, ঝিনাইদহ জেলা ‘দ্য রেড জুলাই’-এর আহ্বায়ক আবু হাসনাত তানাঈম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান, সদস্য সচিব আশিকুর রহমান জীবন, যুগ্ম আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ অন্তর, কেন্দ্রীয় যুব শক্তির সদস্য তাশদীদ হাসান, রাসেল হুসাইন ও হুমায়ুন কবির।
সোমবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের প্রেস নোটে জানানো হয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ¦ালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। যে কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য ফারদিন আহমেদ নিরব ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে যায়। ওই সময় পাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্কের জেরে ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা তাকে মারধর করে। পরে আহত হয়ে মেসে চলে যান ফারদিন আহমেদ নিরব। পরে অসুস্থতা বোধ করলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর হাসপাতালে তিনি মারা যান। ওই ঘটনার জেরে শনিবার রাতেই তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিকের মালিকানাধীন আরাপপুর সৃজনী ফিলিং স্টেশনে হামলা ও ভাংচুর চালায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া রাত সোয়া তিনটার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাড়িয়ে থাকা তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় রোববার বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মো. সাইফ নোমান ও ফিলিং স্টেশন ভাংচুরের ঘটনায় শামসুল কবির মিলন বাদি হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৭ নেতাকর্মীকে আসামী করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
এদিকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আদালতে নেয়ার পথে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আটক বৈষম্যবিরোধী নেতাকর্মীরা। প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন, আমাদের ফাসানো হয়েছে। যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে আমরা কেউ জড়িত নই।
এসময় ন্যায়বিচার নিশ্চিতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আসামীরা চিৎকার বলেন, “আপনার সত্যটা তুলে ধরুন। তেল পাম্পে ভাংচুর ও বাসে অগ্নিসংযোগের সময় আমরা সদর থানার ওসি সঙ্গে থানায় বসে ছিলাম। থানার সিসি টিভি ফুটেজ প্রকাশ করার দাবিও জানান আটক আসামীরা। তারা চিৎকার করতে করতে প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় অভিযোগ করেন, আটকের পরে পুলিশ সদস্যরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়ার কারণে আমাদের নানা ভাবে গালিগালাজ করেছে। পুলিশ আমাদের নানা ভাবে হেনস্থা ও নির্যাতন করেছে। সাজানো মামলায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও প্রিজন ভ্যানে থাকা আসামীরা দাবি করেন। এসময় তারা ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে থাকেন।
এসময় আলোচিত তাজ ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের হামলায় ছাত্র নিহতের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটক নেতাকর্মীরা। তারা অভিযোগ করেন, সৃজনী ফাউন্ডেশনের মালিক অর্থের বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে তার তেল পাম্পের কর্মীদের হামলায় ছাত্র নিহতের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন।
পরে আসামীদের ঝিনাইদহ জুডিশ্যল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী নেতাকর্মীদের আটকের বিষয়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে প্রেস নোট দেয়া হয়। ঘটনার জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেল্লাল হোসেন বলেন, আমরা আপনাদের প্রেসনোট দেবো। আর আমরা যা প্রমাণ করতে চাই, তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে। আপাতত আমরা গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে চাইছি না।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন শিক্ষার্থী ফারদিন আহমেদ নিরব। তিনি ঝিনাইদহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সদস্য। তাজ ফিলিং স্টেশন ও সৃজনী ফিলিং স্টেশনের মালিক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হারুণ অর রশিদ। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।




