কয়রায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ৩০ কেজি চালের পরিবর্তে ২ থেকে ৩ কেজি কম দেওয়া, কার্ডের কথা বলে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া, চাল নিতে গেলে নিজ বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে আসতে বাধ্য করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ ঘটনায় উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক রেশন কার্ডধারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়রা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখের বরাদ্দসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ডিলারের আওতায় মোট ৪১৮টি কার্ডের মধ্যে ১২টি মৃত কার্ড বাদ দিয়ে ৪০৬টি কার্ডের বিপরীতে ১২.১৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী ১২.১৮০ মেট্রিক টন অর্থাৎ ১২ হাজার ১৮০ কেজি চাল ৪০৬টি কার্ডে ভাগ করলে প্রতি কার্ডে ৩০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা।

কিন্তু সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, বাস্তবে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে ৩০ কেজির পরিবর্তে ২৭ থেকে ২৮ কেজি করে চাল পাচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কার্ডের কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এ টাকা নেওয়ার সময় অফিস খরচসহ বিভিন্ন খরচের কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

ভুক্তভোগী মো. আসাদুর রহমান, হালিমা, কালিপদ, মহাসিনসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, “কার্ডের কথা বলে আমাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।”

তাঁদের আরও অভিযোগ, চাল নেওয়ার সময় সরকার নির্ধারিত ৩০ কেজি চালের ইনটেক বস্তা না দিয়ে বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে যেতে বলা হয়। বস্তা নিয়ে না গেলে চাল দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, চাল দেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয় এবং প্রত্যেক কার্ডে ২ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত চাল কম দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সবুর বলেন, “এলাকাবাসী অভিযোগ করলে আমি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানাই। চেয়ারম্যান আমাকে তাঁকে (ডিলারকে) ফোন দিতে বলেন। আমি ফোন দিলে তিনি প্রথমে অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে আমার কাছে অনিয়মের কথা স্বীকার করেন।”

ইউপি সদস্য আরও বলেন, “তিনি আমার কাছে জানতে চান, কীভাবে এর পরিত্রাণ হবে। আমি তাঁকে পরামর্শ দিই—সবার টাকা ফেরত দিয়ে সবার কাছে মাফ চেয়ে ভবিষ্যতে আর করবেন না—এ কথা সবার সামনে বলতে।”

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, “আমিও অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সতর্ক করার পরও তিনি একই ধরনের কাজ করেছেন।”

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

একই বিষয়ে কয়রা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেপ্রসাদ দাশ বলেন, “অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স সালমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল্লাহ সানার কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

সরকারি নথিতে যখন ৪০৬টি কার্ডের বিপরীতে ১২.১৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের তথ্য রয়েছে এবং হিসাব অনুযায়ী প্রত্যেক সুবিধাভোগীর ৩০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা, তখন বাস্তবে যদি ২–৩ কেজি করে কম দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই ঘাটতির চাল গেল কোথায়—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

একই সঙ্গে প্রত্যেক সুবিধাভোগীর কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন। এই টাকা নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান বা অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত যেন শুধু কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং বিতরণ রেজিস্টার, ডিলারের স্টক রেজিস্টার, চাল উত্তোলনের চালান, কার্ডধারীদের তালিকা এবং মাঠপর্যায়ে সুবিধাভোগীদের হাতে দেওয়া চাল ওজন করে প্রকৃত তথ্য বের করা হোক।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন