
একটা দেশের ভবিষ্যৎ কতটুকু পাল্টাবে বা কীভাবে পাল্টাবে তা নির্ভর করে সে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের গুণগত মান, দূরদর্শী নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা, সততা ও নিষ্ঠার ওপর। মেধা, সততা, দক্ষতা- প্রত্যেকটি গুণই আলাদা আলাদাভাবে থাকা উচিত। একটা সমাজের অগ্রগতিও নির্ভর করে সেই সমাজের নীতিনির্ধারকদের ওপর। নীতিনির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে অনেক সভ্যতা যেমন এগিয়ে যায় তেমনি সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে সমাজে দেখা দেয় অরাজকতা। ফলে একটি দেশের রাজনীতিতে মেধাবী, সৎ, দক্ষ ও বিচক্ষণ তরুণদের বিকাশ ঘটবে- সেটাই প্রত্যাশিত।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোগুলো এখন ধীরে ধীরে রাজনীতি নির্ভর হয়ে গেছে। মসজিদ মন্দির থেকে শুরু করে গ্রামের ক্লাবেও এখন রাজনীতিকীকরণ চলে। প্রাইমারী স্কুলের সভাপতি কী আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাকি বিএনপি’র প্রার্থী এ প্রশ্ন যেমন আসে তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার সরকারের কতোটুকু অনুগত তা প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিল্প সাহিত্যের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন একাডেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাজার কমিটি, মহল্লা কমিটি কোথাই নেই রাজনীতি। আমরাই পৃথিবীর অন্যতম দেশ যেখানে মানুষ ক্ষমতাসীন দল ও সরকারকে এক করে ফেলি।
এত কথা বলার উদ্দেশ্যে হলো আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নির্ভর। গ্রামে কেউ মারা গেলে জানাযার নামাজে কে দু’চার কথা বলবে- এমন সিদ্ধান্তেও রাজনৈতিক পরিচয় কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে বেড়েছে প্রতিহিংসা, বেড়েছে নোংরামী।
যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষকে এত ক্ষমতাসীন করে তুলছে, একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ কেউ হয়ে উঠেন দন্ডমুন্ডের কর্তা সেখানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক কর্মীদের গুণগত মান বাড়েনি। মেধাবী, সৎ ও বিচক্ষন মানুষদের রাজনীতিতে আসার পথ দিন দিন বন্ধ হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এর দায়ভার এড়াতে পারেন না।
রাজনীতিতে মেধাবী তরুণরা আসছে না এমন অভিযোগ সবার। কিন্তু কেন আসছে না সেটাও ভেবে দেখা উচিত। সেরকম কয়েকটি বিষয় যদি আলাপ করি তাহলে নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোই উঠে আসবে।
শুধু কেন্দ্রেই নয়, একেবারে তৃণমূলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণ এখন পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এমপির ছেলে যেমন এমপি হয়, চেয়ারম্যানের ছেলে চেয়ারম্যান হয়, এসব এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এ দেশে অনেককিছু পরিবর্তন হয়েছে বা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সামন্তবাদী মনোভাব থেকে আমাদের নেতাদের মুক্ত করার সংস্কৃতি এখানে গড়ে উঠেনি। বড়মনের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ।
বাবা জীবনে বেশ কয়েকবার এমপি মন্ত্রী হয়েছেন। তার বয়স হয়েছে। তার খুব ইচ্ছে দল তাকে মনোনয়ন না দিলে যেন তার ছেলেকে মনোনয়ন দেয়। তিনি মারা যাওয়ার আগে নাতিপুতির চেহারা যেমন দেখতে চান তেমনি ছেলেকে এমপি হিসেবেও দেখতে চান। মারা যাওয়ার আগে এটা তার শেষ ইচ্ছা। বাবাদের এমন ইচ্ছার কবলে পড়ে মাঠে ঘাটে সারাজীবন শ্রম দেওয়া, ঘাম দেওয়া অসংখ্য নেতাকর্মী বলি হয়। কর্মীরা প্রথম জীবনে নেতার পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়, মাঝ বয়সে নেতার ছেলের পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়, শেষ বয়সে নেতার নাতির পেছনে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়। আবার একটু অন্যরকমও দেখা যায়। যেমন রাজার ছেলে বংশ পরম্পরায় রাজা হচ্ছে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হচ্ছে। আর সৈনিক যেমন যুদ্ধের মাঠে রাজার জন্য প্রাণ দিয়েছিল তেমনি তার ছেলেও সৈনিক হয়ে রাজার ছেলের জন্য যুদ্ধের মাঠে প্রাণটাই দিচ্ছে।
আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন মন্ত্রী মহোদয়ের ছেলে কী রাজনীতি করার অধিকার রাখেন না? তিনিও রাষ্ট্রের নাগরিক। কেন তিনি এমপি হওয়ার সুযোগ চাইবেন না? চমৎকার! আমিও সেটাই বলছি। আপনি এমপি হোন, মন্ত্রী হোন, রাষ্ট্রের শিরোমণি হোন কিন্তু বাবার ক্ষমতাকে ব্যবহার করছেন কেন? অতিরিক্ত আনুকূল্য পেয়ে কেন? সৎসাহস থাকলে কর্মীদের কাতারে এসে আট দশ বছর মাঠে ঘাটে কাজ করুন। বাবার পরিচয়ের বাড়তি সুবিধাটুকু দূরে সরিয়ে রাখুন। কর্মীদের সাথে থেকে মানুষ চিনুন। তারপর না হয় একটা মহড়া হবে!
মন্ত্রী মহোদয় যখন তার দলীয় দায়িত্ব, রাজনৈতিক পরিচয় পারিবারিক সম্পত্তির মতো তার সন্তানের কাছে হস্তান্তর করতে উদ্যত হন তখন কী তার লজ্জা লাগে না? এটা ব্রিটিশ আমল নয়। জমিদারের ছেলে জমিদার হতো। তাই বলে এমপি’র ছেলে এমপি হবে এমন প্রভাব খাটানোর আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন। উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ী গাড়ী সম্পত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে এমপি বানানোর, চেয়ারম্যান বানানোর যে অপচেষ্টা তা একটি শোষনহীণ সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা। অসংখ্য মাঠকর্মীর সাথে সরাসরি বেঈমানি। কিছু মানুষ শুধু বংশপরম্পরায় ‘অভিনন্দন’ দিয়েই যাবে আর একটি পরিবার বংশপরম্পরায় ‘অভিনন্দন’ পেয়েই যাবে আজকের বাংলাদেশে এটা সবচেয়ে বড় অশ্লীলতা। এর ফলে মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন তরুণরা রাজনীতিতে বিমুখ হচ্ছে। তারা রাজনীতির চেয়ে নিজের ক্যারিয়ারে সময় দেওয়াটা সম্মানজনক মনে করছে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে জাতি, রাষ্ট্র।
দলীয় কর্মী হওয়া ও নেতার ব্যক্তিগত কর্মী হওয়া এককথা নয়। বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা দুটো বিষয়কে এক হয়ে যেতে দেখছি। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে নেতার আনুগত্য দেখাতেই বেশী ব্যস্ত। ঔপনিবেশিক ধ্যানধারনা আমাদের চিন্তায় মজ্জায় গেঁথে আছে। অতি তোষামোদী করে একটু বেশী সুবিধা পাওয়ার আশায় দলীয় কর্মীরা বড় নেতার ব্যক্তিগত তোষামোদীতেই ব্যস্ত থাকে বেশী।
দলীয় গঠণতন্ত্রে যাই লেখা থাকুক না কেন কর্মীদের ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ধারিত হয় নেতার মনমর্জি মত৷ কর্মীদের যোগ্যতা, অবদান কোন কিছুই বিবেচনায় আসেনা। মেধাবী তরুণরা খানিকটা আত্মসম্মানের কারণেই পিছিয়ে যায় তোষামোদী প্রতিযোগিতায়। এ সুযোগে এগিয়ে যায় অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত গন্ডমূর্খ ও সুবিধাবাদীর দল। তারাই ধীরে ধীরে বড় নেতা হয়। রাজনীতিতে আরো একধাপ পিছিয়ে যায় মেধাবী তরুণরা। দলীয় কর্মী যখন ব্যক্তিগত কর্মী হিসেবে পরিচিতি পায় তার চাইতে বড় অশ্লীলতা আর কী হতে পারে?
‘রাজনীতি’ ও ‘সওদাগরি’ দুটো যদি এক হয়ে যায় সেখানে ভাল মানুষদের অস্তিত্ব টিকবে না সেটাই স্বাভাবিক। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের জেলা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একটা হাটবাজার হাটবাজার ভাব। আগে কর্মীরা নেতা বানাতো। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতারা নেতা বানায়। এখানে দল ও দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা হতে টাকা লাগে। নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। যার টাকার পরিমাণ যতো বেশী রাজনীতিতে সে টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ততো বেশী। প্রার্থীর গুণগত মান বা রাজনীতিতে তার অবদান এখানে দেখা হয়না। প্রার্থী কতোটা জনমুখী বা জনবিচ্ছিন্ন কিনা তাও এখানে আলোচনায় আসে না।
একদশক আগের চেয়ে পরিস্থিতি এখন আরো খারাপ। একদশক আগে প্রার্থীরা ভোটারদের টাকা দিত। এতে সাধারণ মানুষ টাকাটা হলেও অন্তত পেত। এখন টাকা দিতে হয় সরাসরি নেতাদেরকে। এর ফলে যাদের অবৈধ আয় আছে তারাই নেতৃত্বের দৌড়ে, জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে। আরেক ধরনের লোক এ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়৷ তারা ভীষন আত্মবিশ্বাসী। তারা এটুকু বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে রাখে যে, নির্বাচিত হলে বা জনপ্রতিনিধি হলে এ টাকা তারা উসুল করে আনতে পারবে যেকোন পন্থায়।
বাণিজ্য করার জন্য যেমন ঝুঁকি নিতে হয়, আমাদের অনেক জনপ্রতিনিধিরাও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা রাখেন। সাধুবাদ পাওয়ার মতো ব্যাপার বটে!
যারা চিন্তায় কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব লালন করে থাকেন তারা এই প্রতিযোগিতায় আগ্রহবোধ করেন না। ফলে তারা রাজনীতি বিমুখ হয়। তাদের শুণ্যস্থান পূরণ করে টাউট শ্রেণী। সহজ বাংলা ‘নেতৃত্ব’ ও ‘জনপ্রতিনিধিত্ব’ এখন এখানে দোকানের পণ্য। নেতাদের অফিস, বাসভবন বা ড্রয়িংরুম পরিচিতি পায় দোকান হিসেবে। নেতৃত্বের আশায় বা জনপ্রতিনিধি হওয়ার আশায় দৌড়ে থাকা পাতিনেতাটি এখানে ক্রেতা। সচরাচর অন্যদোকানের সাথে এখানে একটা পার্থক্য আছে। অন্য দোকানে সব জিনিসের একই মূল্য। কিন্তু বর্তমানের রাজনৈতিক সওদাগরিতে যে বেশী টাকা দিতে পারবে পণ্যটি তার। বুঝতে নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে না পণ্যটি কী? পণ্যটি কখনো ‘নেতৃত্ব’ কখনো ‘জনপ্রতিনিধিত্ব’।
যে দেশের রাজনীতি পেশীশক্তি ও পুঁজির নিয়ন্ত্রনে চলে যায়, পরিচ্ছন্ন মনোভাবের মানুষরা যেখানে রাজনীতিতে আগ্রহ হারায়, দীর্ঘদিন মাঠে ময়দানে পরিশ্রম করার পরও দিনশেষে যখন কর্মীদের মুখ থেকে নেতার গুণধর পুত্রমশায়রা নির্বাচনী মনোনয়ন ছিনতাই করে বা ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায়- তখন সে রাজনীতি প্রজন্মের জন্য মোটেও আশাপ্রদ নয়, একথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
তাহলে করণীয় কী? করণীয় হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মেধাবী তরুনদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নতুন করে যুগোপযোগী ভাবনাগুলোকে উস্কে দেওয়া। ধর্মীয় অন্ধত্ব যেমন কাম্য নয় তেমনি দলকানা হওয়াও দেশের জন্য বিপজ্জনক। কোন অবস্থাতেই রাজনীতি বিমুখ হওয়া যাবে না। জনসম্পৃক্ত হওয়ার বিকল্প নেই। ‘মেধা’র চেয়ে বড় কোন শক্তি নেই। লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। বিজয় সুনিশ্চিত।
(দুই)
বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা এতো সহজ নয়। কোন না কোনভাবে আমরা সবাই অদৃশ্য বৃত্তবন্দী হয়েই থাকি! ক্ষমতার মোহ, সম্পর্কের মোহ, আধিপত্যের মোহ, পুঁজিবাদের দাসত্ব- আমাদের পিছু টেনে ধরে। দিন শেষে আমরা ঠিক সেভাবেই বৃত্তে ঢুকে যাই যেভাবে শেয়াল নিজের গর্তে ঢুকে।
পৃথিবীটা অনেক বড়, অনেক বিশাল। এর নানা দিক, নানা ক্ষেত্র, নানা ব্যপ্তি। অথচ আমরা গর্তের নানা দেয়ালে হোঁচট খেতে খেতে রক্তাক্ত হই। তবু বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার সাহস করি না। বৃত্তের ভেতরেই অপ্রয়োজনে নিজেদের বিসর্জন দেই বারবার।
মানুষ ভীষণ সম্ভাবনাময়ী একটা প্রাণী। সেই সম্ভাবনা আমরা অপ্রয়োজনে শেষ করি সারাজীবন জুড়েই। কতো শক্তির অপচয় আমরা করি। কতো মেধা আমরা ঢেলে দিই যেখানে সেখানে। একবারও ভাবা হয় না – এটার আউটপুট কী!
আমরা পুরানো পথে হাঁটতে অভ্যস্ত জাতি। নতুন পথ আমরা খুঁজিনা। নতুন মত নিয়ে আমরা ভাবতে চাই না। নানা ধরনের ভয়ে আমরা চুপ করে থাকি। নানা ধরনের লোভ আমাদের মুখ বন্ধ করে রাখে। কতৃপক্ষকে খুশী রেখে একটু অনুগ্রহ পাওয়ার লোভ। কিন্তু ইচ্ছে করলেই, একটু ঝুঁকি নিলেই রচিত হতে পারে নতুন মত নতুন পথ।
গতকাল যে ওষুধের মেয়াদ ছিল আজ সে ওষুধের মেয়াদ নাও থাকতে পারে। গতকাল যে মন্ত্রে কাজ হয়েছে আজও সেই মন্ত্রকে শিরোধার্য করা কতোটা যৌক্তিক। আজকের সিদ্ধান্ত আজকের বাস্তবতা বিবেচনা করেই নিতে হবে। একবার যিনি ব্র্যান্ড হয়ে যান তাকে আজীবন ব্র্যান্ড রাখতে গেলে সমস্যা তো দেখা দিবেই। পুরনো পথে না হেঁটে আজকের দিনে আমাদের করণীয় কী তা নিয়ে মাথা ঘামানোর বিকল্প নেই। মাথাটা খাটানোর জন্য। শুধু ঘুমানোর জন্য নয়।
রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য রাষ্ট্র। আইনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই আইন। কিন্তু আমরা যখন রাষ্ট্রের জন্য, রাজনীতির জন্য বলি হই তখন বুঝা উচিত অতীতে আমরা যে পথে হেঁটেছি তা ভুল ছিল। কাগুজে কথায় সময় পার করা যায়, কিন্তু জীবন উপভোগ্য হয় না। একটাই তো জীবন৷ আর কতো আমরা ধৈর্য্য ধরে পুরনো মতে চলব পুরনো পথে হাঁটব তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
যুগে যুগে কালে কালে অনেকে অনেক পথ দেখিয়েছেন। অনেকে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বলে গেছেন৷ কিন্তু অব্যবহৃত জ্ঞান আমাদের আর দরকার নেই। আমাদের প্রয়োজন মুক্তি। আমরা এখন মুক্তি চাই। এজন্য প্রয়োজন সংঘবদ্ধতা। প্রয়োজন সম্মিলিত শক্তি। অসংখ্য ভণ্ডের ভীড়ে এমন একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার যেখান থেকে নতুন করে মানুষকে স্বপ্ন দেখানো সম্ভব। সেই নতুন দিনের প্রত্যাশায় এগিয়ে আসতে হবে তারুণ্যকে।
প্রত্যেকটা মানুষ নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের নিজস্ব একটা চিন্তার জগৎ আছে। নিজের মতো করে ভাবনা আছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। প্রত্যেকের স্বাতন্ত্র্যবোধ আছে।
আপনি ( যিনি এ মুহুর্তে আমার এ লেখা পড়ছেন) আপনিও নিজের মতো করে ভাবেন। নিজের মতো করে চিন্তা করেন। আপনারও পছন্দ – অপছন্দ আছে। আপনারও মতামত দেওয়ার অধিকার আছে। অন্যের মতামত যদি অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়, আপনার মতামতও কারো না কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারো কাছে না হোক, আপনার মতামত আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের মনের কথা শুনতে চাই না। নিজের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজের সাথে বা অন্যের সাথে আলাপ আলোচনা করিনা। অন্যের মতামতকে শিরোধার্য করি বিনা তর্কে, বিনা দ্বিধায়। এভাবে অন্যের মতামত মেনে নিতে নিতে – নিজের মনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নিজের মন মতামত দিতেই ভুলে যায়। নিজের উপর নিজের বিশ্বাস খাটো হয়ে যায়।
অপরিণত সন্তান গর্ভে মারা গেলে সে যেমন পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ পায়না তেমনি নিজের মতামত নিজের ভেতর মেরে ফেললে নিজের মনটাও পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাঁচলেন! সত্তর, আশি বা একশ বছর! কিন্তু কখনো নিজের মনের দরজায় কড়া নাড়লেন না! ব্যাপারটা কেমন না!
নিজেকে ভালোবাসুন। নিজের মনের কথা নিজে শুনুন। অন্যকে শোনান। মুখ ফুটে বলা শুরু করুন। কেউ আপনার কথা শুনছে না? পাত্তা দিচ্ছে না? মনোবল হারাবেন না। আপনার কথায় যদি কোন ‘মেসেজ’ থেকে থাকে তা ঠিকই কোথাও না কোথাও জায়গা করে নিবে। আপনার চিন্তা থেকেই শুরু হতে পারে কোথাও না কোথাও গতিপরিবর্তন।
আপনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, বড় শিল্পপতি, সাংবাদিক, উর্দ্ধতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা- যাই হোন না কেন নিজের মনের কথাই যদি না শুনলেন, না বললেন- তাহলে জীবনটা পণ্ডশ্রম নয় কী?
আজকে যারা তরুণ, আজকে যারা যুবক তাদের জেগে উঠার বিকল্প নেই। নিজ নিজ অবস্থান থেকেই এগিয়ে আসতে হবে। এদেশটা আমার, আপনার, আমাদের সবার। নিজেকে ছোট ভেবে পিছিয়ে রাখবেন কেন? দেশটা আপনার। দেশের জন্য মতামত দেওয়ার অধিকার আপনার আছে। হতে পারে আপনার সাথে অন্যের মতামত মিলবে না। তাতে কী! আপনি আপনার জায়গা থেকে নতুন দাবি নিয়ে এগিয়ে আসুন। দেখবেন, অনেকেই ধীরে ধীরে আপনার সাথে আসছে। এভাবেই শুরু হয়।
আর যদি সাথে কাউকে না পান, নিজেই এগিয়ে যান। আগামী দিনের নির্মাতা হতে পারবেন আপনিই। আপনার কথা মাথায় রেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে’যদি তোর ডাক শুনে কেউ নাই আসে,তবে একলা চলোরে।





