বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের এক অতি দুর্গম পাহাড়। চারিদিকে মেঘের আনাগোনা আর সবুজের সমারোহ, কিন্তু শিক্ষার আধুনিক আলো সেখানে পৌঁছানো ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পাহাড়ের খাঁজেই এখন প্রস্ফুটিত হচ্ছে একঝাঁক ‘বুনোফুল’—প্রান্তিক পর্যায়ের পাহাড়ি শিশুরা, যাদের চোখে এখন আর কেবল অন্ধকারের ভয় নেই, বরং সেখানে ঝিলিক দিচ্ছে আগামীর স্বপ্ন।
২০১৬ সালে ফ্রিল্যান্সার শাহরিয়ার এবং স্থানীয় তরুণ উথাইয়া মারমার উদ্যোগে ‘পাওমুম থারকলা’ বা ‘নতুন কুঁড়ি’ নামে এই ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। বাঁশ ও গাছের তৈরি দুই তলার পরিবেশবান্ধব এই স্কুলে বর্তমানে ৭৮ জন শিশু পড়াশোনা করছে। পাহাড়ি জনপদে যেখানে আধুনিক জীবনযাত্রা পৌঁছানো কঠিন, সেখানে এই স্কুলটি যেন এক তিলক আলো।
এই জনপদের মানুষের জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক, নেই কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল। পড়াশোনার খরচ মেটানো যেখানে বিলাসিতা, সেখানে এই বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা নগদ টাকার বদলে নিজেদের ফলানো চাল, ডাল কিংবা সবজি দিয়েও সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলছেন। সন্তানদের চোখে শিক্ষার আলো দেখতে পাওয়ার এই আকুতি সত্যিই বিরল।
দীর্ঘদিন প্রচণ্ড গরমে আর ল্যাম্পের টিমটিমে আলোয় পড়াশোনা করা এই শিশুদের জীবনে সম্প্রতি এসেছে এক বড় পরিবর্তন। সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তাদের স্কুলে জ্বলেছে বৈদ্যুতিক বাতি, মাথার ওপর ঘুরছে ফ্যান।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ট্রেন ওয়াইম ব্রো আর চতুর্থ শ্রেণির তুংলেং ব্রো’র চোখেমুখে সেই বিস্ময় আর অবারিত আনন্দ কাটছেই না। তাদের ভাষায়:
“ঢাকায় গিয়ে এমন আলো দেখেছি, আমরাও যে এমন আলোয় পড়তে পারবো ভাবিনি। এখন অনেক মজা হবে!”
মৌ পাহাড়ের এই বুনোফুলদের স্বপ্ন এখন কেবল আলো আর ফ্যানেই সীমাবদ্ধ নেই। উদ্যোক্তারা এখন স্কুলটিতে অনলাইন ক্লাস চালু করার স্বপ্ন দেখছেন। তারা চান দুর্গম পাহাড়ে বসেও এই শিশুরা যেন দেশ-বিদেশের মানসম্মত শিক্ষা পেতে পারে। আধুনিক আইসিটি সামগ্রী আর স্টারলিংক নেটওয়ার্কের সহায়তা পেলে এই ‘নতুন কুঁড়ি’রা আধুনিক শিক্ষার আলোয় পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বান্দরবানের এই প্রান্তিক শিশুরা আজ আর কেবল অবহেলিত কোনো গোষ্ঠী নয়। স্বেচ্ছাশ্রম আর মানবিক ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এই স্কুলটি এখন দুর্গম পাহাড়ের অন্ধকারে প্রমিথিউসের আলোর মশালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই বুনোফুলগুলো একদিন সুশিক্ষিত হয়ে পুরো দেশ, জাতি ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে। পাহাড়ের বুক চিরে প্রস্ফুটিত এই প্রাণের স্পন্দনগুলোই হবে আগামীর পাহাড়ে আলোর মশাল




