দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে দেশের নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ প্রায় সব খাতেই খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ সংসারের ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা।
গাজীপুরে কর্মরত ৫০ বছর বয়সী গার্মেন্টস শ্রমিক নুরুজ্জামান জানান, মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতনে চার সদস্যের একটি পরিবার নিয়ে চলা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “মাসের শুরুতেই বাসাভাড়া ৩ হাজার টাকা, গ্যাস বিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা, বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১ হাজার টাকা দিতে হয়। এরপর চাল কিনতে দেড় হাজার টাকা, তিন লিটার সয়াবিন তেলে প্রায় ৬০০ টাকা, মাছ, মাংস, মুরগি ও কাঁচাবাজার মিলিয়ে আরও কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা ফুরিয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় অনেক বেশি আসছে। সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না।”
একজন হকার জানান, তার পাঁচ সদস্যের পরিবার। সারাদিন পরিশ্রম করে গড়ে ৫০০ টাকা আয় হয়। তিনি বলেন, “দিন শেষে বাজার-সদাই, খাবার, বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে হাতে কিছুই থাকে না। অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে যায়।”
অন্যদিকে এক কৃষক জানান, কৃষি উৎপাদনের খরচ প্রতিনিয়ত বাড়লেও সেই অনুপাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিক্রির সময় সেই খরচও ওঠে না। ফলে কৃষক পরিবার চালাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে।”
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক পরিবার এখন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলমূলসহ আমিষ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত কিনতে পারছেন না অনেকেই। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবার চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ে কাটছাঁট করছে এবং প্রয়োজনীয় পোশাক বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাও সীমিত করে ফেলেছে। সীমিত আয়ের মানুষের কাছে প্রতিদিনের জীবনযাপন এখন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা এবং বাজারে নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি করা গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাস্তবতায় দেশের লাখো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতিদিন আয়-ব্যয়ের কঠিন সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছে। তাদের প্রত্যাশা—জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকুক এবং পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হোক।



