
রাত তখন পৌনে দুইটা। সড়কে যানবাহন চলাচলও তুলনামূলক কম। সিলেটের উদ্দেশে ভালুকা থেকে যাওয়া একটি মাইক্রোবাস কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের নোয়াগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা তিন ব্যক্তি গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। কাছেই পুলিশের একটি গাড়ি দেখতে পেয়ে চালক ও যাত্রীরা ওই ব্যক্তিদের পুলিশ সদস্য মনে করে গাড়ি থামান। এরপর দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মাইক্রোবাসের যাত্রীরা।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুলিশের দাবি, মাইক্রোবাসটি হঠাৎ সড়কে থেমে গেলে বিষয়টি দেখতে তারা গাড়িটির সামনে যায়। পুলিশকে দেখে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা পাননি। একই ঘটনাকে ঘিরে ভুক্তভোগী ও পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি।
ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। মাইক্রোবাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ ১৪-৯৩১০। ঘটনাস্থলে কুলিয়ারচর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন, এসআই সুজন বিশ্বাসসহ পুলিশের একটি দল উপস্থিত ছিল।
ভুক্তভোগী সারোয়ার আলমের ভাষ্য, মাইক্রোবাসটিতে মোট আটজন যাত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুইজন পুরুষ, দুইজন নারী ও চারটি শিশু। ভালুকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে নোয়াগাঁও এলাকায় পৌঁছালে রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা তিন ব্যক্তি গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। কিছুটা দূরে পুলিশের গাড়ি দেখতে পাওয়ায় তাঁদের পুলিশ সদস্য মনে করে গাড়ি থামানো হয়। পরে কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ভয় দেখিয়ে মালামাল নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সারোয়ার আলমের দাবি, ঘটনায় প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হয়েছে। এর মধ্যে চেইন, কানের দুল, আংটি ও চুড়ি রয়েছে। এছাড়া দুটি Oppo স্মার্টফোন, একটি Xiaomi 8 ট্যাব, একটি GoPro ক্যামেরা, Nothing ব্র্যান্ডের হেডফোন এবং প্রায় এক লাখ টাকা নগদ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ক্রেডিট কার্ডও খোয়া গেছে বলে জানান তিনি।
সারোয়ারের আরও অভিযোগ, লুটপাটের সময় ১৪ মাস বয়সী একটি শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখানো হয়। হামলাকারীরা একে অপরকে বিভিন্ন নামে ডাকছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে ‘জুয়েল’ নামে ডাকতে শুনেছেন বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ডাকাতির শেষ পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ গজের মধ্যে অবস্থান করছিল। এ সময় একজন পুলিশ সদস্য পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পেছনে দৌড় দিলেও এসআই সুজন তাঁকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন বলে অভিযোগ করেন সারোয়ার আলম।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া মালামালের বিবরণ নেওয়ার সময় হামলাকারীদের একজন পেছন দিক দিয়ে ঘুরে আরও তিন-চারজনের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। তাঁরা ওই ব্যক্তিকে ডাকাতির সময় উপস্থিত থাকার কথা পুলিশকে জানালে পুলিশ তাঁর ছবি ও পরিচয় নেয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা
ঘটনার পর কী করা উচিত, সে বিষয়েও পুলিশকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলে জানান সারোয়ার আলম। তাঁর দাবি, মামলা বা লিখিত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ তাঁদের কোনো পরামর্শ দেয়নি। শুধু নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কুলিয়ারচর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, পুলিশ কুলিয়ারচরের শেষ সীমানা থেকে কুলিয়ারচরের দিকে আসছিল। বিপরীত দিক থেকে মাইক্রোবাসটি ভৈরবের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাইক্রোবাসটি সড়কে দাঁড়িয়ে গেলে কেন থেমেছে তা দেখতে পুলিশ গাড়িটি সামনে নিয়ে একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করায়। এ সময় পুলিশকে দেখে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ঘটনাস্থলে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ পুলিশ পায়নি। তাই এটিকে ডাকাতির ঘটনা বলা যাচ্ছে না।
তবে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় ঘটনার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা ব্যক্তিদের সংকেতেই তাঁরা গাড়ি থামিয়েছিলেন এবং এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।
দুই পক্ষের বক্তব্যে এমন স্পষ্ট পার্থক্যের কারণে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে। রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা ওই তিন ব্যক্তি কারা? কেন তাঁরা মাইক্রোবাসটি থামানোর সংকেত দিয়েছিলেন? পুলিশকে দেখে যারা দৌড়ে পালিয়েছিল, তারা কারা? ভুক্তভোগীদের দাবি করা স্বর্ণ, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালামালের কোনো সন্ধান বা আলামত পাওয়া গেছে কি না,এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসা জরুরি। কারণ একই ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী ও পুলিশের বক্তব্যে এতটা পার্থক্য থাকলে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া জনস্বার্থেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।





