বাবার চোখের পানি মুছতে গিয়ে ৩ মাস ধরে বিছানায় কাতরাচ্ছে দশম শ্রেণির প্রিতম

এটাকে কি ঘর বলা যায়? এ যেন কষ্টের এক নদী। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়ালিয়া হিন্দু পাড়ায় প্রতিবেশীদের দয়ায় সরকারি জায়গায় কোনোমতে তোলা একটি ঘর। টিনের চালে হাজারো ফুটো। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরেও বাইরের মতো বৃষ্টি নামে। আর সেই ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে বিছানায় গত তিন মাস ধরে পড়ে আছে একটি তাজা প্রাণ। তার নাম শ্রী প্রিতম কুমার বিশ্বাস (১৬)। দশম শ্রেণির ছাত্র।
প্রিতমের বাবা শ্রী রোকন বিশ্বাস (৫৫)। পিতা মৃত অনিল চন্দ্র বিশ্বাস। নিজে প্রতিবন্ধী, শরীরে নানা রোগ। পেশায় অটোরিকশা চালক। কিন্তু তার ভাঙা শরীর দেখে যাত্রীরা তার গাড়িতে উঠতে চায় না। তাই দিনের পর দিন ঘরে চুলা জ্বলে না। মা পপি রানী বিশ্বাস (৩০) নিজের বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা নিয়ে দিন কাটান, কিন্তু টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে যেতে পারেন না। ঘরে আছেন বৃদ্ধা ঠাকুরমা শ্রীমতী প্রমিলা বিশ্বাস ও আট বছরের ছোট্ট বোন কুমারী প্রিউ বিশ্বাস।
জানা যায়, বাবার এই অসহায়ত্ব, মায়ের চোখের পানি আর সহ্য করতে পারেনি ছোট্ট প্রিতম। তাই তো তিন মাস আগে বাবার অটো গাড়িটি নিয়ে বের হয়েছিল সে, যদি দুটো টাকা আয় করে বাবার মুখে হাসি ফোটানো যায়। কিন্তু কে জানতো, বাবার কষ্ট দূর করতে গিয়ে নিজেই সে হারিয়ে যাবে অন্ধকারে। পথে ঘটে যায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা।
প্রথমে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, তারপর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। চার দিন চিকিৎসা চলার পরই ফুরিয়ে যায় সব টাকা। চিকিৎসকরা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলেন। এখন গ্রামের পল্লী চিকিৎসক দিয়ে কোনোমতে চলছে তার চিকিৎসা। চিকিৎসক বলেছেন, দ্রুত আরও একটি অপারেশন না হলে প্রিতম আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না।
বাবা শ্রী রোকন বিশ্বাস বলেন, “আমি প্রতিবন্ধী দেইখা আমার গাড়িতে কেউ উঠবার চায় না। আমার কষ্ট দেইখা আমার পোলাডা গাড়ি নিয়া বের হইছিল। আজ আমার কারণেই আমার পোলাডা মরতে বসছে। আমি বাপ হইয়া ছেলের চিকিৎসা করাতে পারতাছি না। এর চাইতে মরণ ভালো।
মা পপি রানী বিশ্বাস বলেন, “আমার বুকের ব্যথায় আমি রাইতে ঘুমাইতে পারি না। আর আমার ছেলেটা ব্যথায় চিৎকার করে। টিনের ফুটা দিয়া পানি পড়ে আমার ছেলের গা ভিজে যায়, আমি আঁচল দিয়া মুছি। ও মা হইয়া এই কষ্ট আর দেখতে পারতাছি না। আপনারা আমার বুকের মানিকরে বাঁচান।
বিছানায় শুয়ে প্রিতম বলে, “মা, আমার পা টা খুব ব্যথা করে। আমি কি আর কোনোদিন স্কুলে যাইতে পারমু না? আমি হাঁটতে চাই মা।
ঠাকুরমা শ্রীমতী প্রমিলা বিশ্বাস বলেন, “আমার নাতিটা লক্ষ্মী ছেলে আছিল। আমার চোখের সামনে তিলে তিলে শেষ হইয়া যাইতাছে। ভগবান, তুমি আমাদের মতো গরিবদের কেন এত কষ্ট দাও?
স্থানীয়রা জানান, আমরা সবাই মিলে ঘর তুলে দিছি, কিন্তু ঘরের চাল ফুটা। আমরা গরিব মানুষ, চাঁদা তুলে আর কত দিমু? ছেলেটার অপারেশনে অনেক টাকা লাগবে।
এটা কোনো ভুল ছিল না। এটা ছিল একজন সন্তানের বাবার প্রতি ভালোবাসা। বাবার চোখের পানি মুছতে গিয়ে আজ নিজেই কান্নার সাগরে ভাসছে প্রিতম। একটি অপারেশনই পারে তাকে আবার হাঁটাতে। কিন্তু টাকার অভাবে তার সব স্বপ্ন আজ টিনের ফুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির পানির সাথে ভেসে যাচ্ছে।
অসহায় পরিবারটি প্রিতমের চিকিৎসার জন্য সমাজের হৃদয়বান মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে।
সাহায্য পাঠাতে – শ্রী প্রিতম কুমার বিশ্বাস, বিকাশ নম্বর: ০১৩২৮৬৯৫২৯০

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

প্রত্যাশিত সিরাজগঞ্জের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংবর্ধনা পেলেন দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী

সিরাজগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রত্যাশিত সিরাজগঞ্জের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়েছে।