ময়মনসিংহ পৌর ভূমি কর্মকর্তা জীবন কুমারের সম্পদের উৎসের তদন্ত দাবী বিভিন্ন মহলে

ময়মনসিংহ পৌর ভূমি কর্মকর্তা জীবন কুমার বিশ্বাসের  বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতি করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ রয়েছে।  অভিযোগ উঠেছে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে  তিনি ভালুকা উপজেলায় চাকরী করে ঘুরে ফিরে একই একই উপজেলায় কাজ করে  হয়ে যান ভূমির মাফিয়া। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও গুণধর এ ভূমি কর্মকতা এখনো রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
এনিয়ে এর আগেও একাধিক সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ হলেও  তার এসব সম্পদের উৎস কি তার কোন তদন্ত না হওয়ায় বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা সমালোচনা। একজন নায়েবের বেতন কত? এত সম্পদের উৎস কি?  কিভাবে তিনি এই বিশাল সম্পদের মালিক হলেন? এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগ রয়েছে- নায়েব জীবন কুমার বিশ্বাসের পারিবারিক অবস্থার তেমন উন্নতি না থাকলেও ভূমি অফিসে চাকরীর সুবাদে বর্তমানে তিনি  তার  নিজ এলাকা নগরীর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সংলগ্ন কিসমত মৌজায়  প্রায় ৬ একর জমির মালিকানাসহ ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ।এছাড়াও তার নামে-বেনামে রয়েছে বহু সম্পদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স।
সুত্র জানিয়েছে ভূমি সহকারী পদে চাকুরী পাওয়ার পরই তিনি এসব সম্পদ উপার্জন করেছেন। এ যেনো আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতোই একটি কাহিনী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে- ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসাবে তিনি যেখানেই চাকুরী করেছেন সেখানেই ভূমি অফিসকে  ঘুষ দুর্ণীতির আখড়া বানিয়ে কোটি-কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানির পাশাপাশি নিয়েছেন খজনার অতিরিক্ত টাকা। ঘুষের টাকা না পেলে সেবা গ্রহীতাদের হয়রানী করাসহ তার বিরুদ্ধে জমির নামজারি, ডিসিআর ও মিসকেসসহ না খাত থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জীবন কুমার  কুমার  বেশি হয়রানি করেন নামজারি, দাখিলা কাটা ও মিসকেস নিয়ে। নামজারীর জন্য অনলাইনে আবেদন করা হলেও প্রতিবেদন নিতে তাকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। টাকা না দিলে প্রতিবেদন দিতে দেরী করে। এ ভাবে তিনি মানুষকে জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে গড়েছেন অঢেল সম্পদ । আবার নামজারী কেস মঞ্জুর হলে ডিসিআরের জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবী করেন। এরপর হোল্ডিং নম্বরের জন্য ভূমি অফিসে গেলে সেখানেও থাবা বসান জীবন কুমার।ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে হয়রানি করেন সেবা গ্রহীতাদের। আবার টাকা পেলেই অনিয়মকে নিয়মে পরিণত  করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে- জীবন কুমার গত ১৯৯৬ সালে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পদে চাকুরীতে যোগদান করেছেন। জেলার শিল্পাঞ্চল নামে খ্যাত  ভালুকা উপজেলা সদর সহ হবিরবাড়ী ইউনিয়ন, মল্লিক বাড়ী ইউনিয়নে প্রায় ১২ বছর চাকুরী করে কয়েকশত কোটি টাকার মালিক হন। ভালুকার মল্লিকবাড়ী  ইউনিয়নের ভূমি সহকারী হিসাবে থাকাবস্তায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন  অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে  ময়মনসিংহের সদর উপজেলার বোররচর ইউনিয়নে বদলী করা হয়, বোররচর ইউনিয়নে  মাত্র ২২দিন চাকরী করে পাড়ি জমান  ময়মনসিংহের পৌর ভূমি অফিসে। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ পৌর ভূমি অফিসেই কর্মরত আছেন।  মাত্র ২৯ বছর চাকরি করেই গড়েছেন অঢেল সম্পদ। কানাঘুষা চলছে- ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। এসব সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে এমন কোনো অসাদু উপায় নেই যা জীবন কুমার ব্যবহার করেন নি।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে- ময়মনসিংহ নগরীর জিলা স্কুলের পাশে নজরুল সেনা স্কুল সংলগ্ন বাড়ী, নতুন বাজার সাহেব আলী রোড -বাউন্ডারি রোডের কোণায় ভীটু বিল্ডিং, ধোপাখোলা মোড়ের পাশে হান্নান সাহেবের গ্যারেজ সংলগ্ন ড্রীম টাওয়ার নামে বাড়ী নির্মাণ (চলমান কাজ) সহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সংলগ্ন কিসমত মৌজায় গড়েছেন প্রায় ৬ একর সম্পদ। ইতোমধ্যে ভবন  কাজ সম্পন্ন হয়েছে যেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে।  সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
তার নিজ এলাকায় সমালোচনা চলছে- এক সময়ের নুন আনতে পানতা ফুরানো পরিবারের সন্তান ভূমি অফিসের সরকারী চাকুরিটা  পেয়ে যেনো আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন। চেরাগ থেকে বেরিয়ে আসা জ্বীনের কাছে যেনো  জীবন কুমার বাবু সম্পদ চেয়েছেন আর অমনি জ্বীন সাহেব এগুলো দিয়ে দিলো। তা না হলে একজন নায়েবের মাসে কত বেতন আর পরিবারের মাসিক খরচ শেষে কতটাকা আয় থাকে? তাহলে এই সম্পদের উৎস কোথায়? অনেকেই বলছেন দুদক তদন্ত করলেই সব থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকজন  ভুক্তভোগী জানান,- হবিরবাড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কারখানা মালিকদের সাথে লিয়াজো করে জমির কাগজপত্র গড়মিল দেখিয়ে কোম্পানিকে কমমুল্যে জমি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়েও তিনি ছিলেন পারদর্শী।বিভিন্ন কোম্পানি মালিকগণ তাকে দিতেন মোটা অংকের অর্থ। এভাবে তার ষড়যন্ত্রের জালে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। আওয়ামী লীগের ছোট বড় নেতাদের সাথে যোগসাজস করেও গড়েছেন অঢেল সম্পদ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে-ভালুকায়  যোগদানের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে যোগসাজস করে  নয়ছয় করে সরকারী পুকুর লিজ, খাস জমি লিজ, মালিকানা জমির খাজনা খারিজে বাধ্যতামূলক ঘুষ রীতি চালু, জালিয়াতি করে সম্পদ গড়তে থাকেন তিনি। এমন কি সরকারী জায়গা পজিশন বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নায়েব জীবন কুমার  উপজেলা ভুমি অফিসে চাকরি করার সময় শুধু পজিশন দেয়ার নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাতিয়েছে কোটি টাকা।  একেকজন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ- লাখ টাকা নিয়ে পরিজশন না দিয়ে শুধু ভুয়া ডিসিআর দেয়া হয়। টাকা নিলেও কোনো ব্যবসায়ীকে তিনি পজিশন বুঝে দেননি।
 বিগত সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে যোগসাজস করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে  সরকারি জায়গা জালিয়াতি করে বিভিন্ন  ব্যক্তির নামে করে দেন এই ভূমি সহকারী কর্মকর্তা।  নামে বেনামে সমিতি করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে আতাত করে লিজ দেন । আর সেখান থেকেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। মূলত  ভুমি অফিসে তিনি খাজনা খারিজের একটি নিয়ম চালু করেছিলেন। এক দলিলে এক বিঘা জমি থাকলে খাজনা বা খারিজ করতে তাকে সর্বনিম্ন ৫-১০ হাজার টাকা দিতে হতো। খাজনা খারিজের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১লাখ টাকা রেট বেধে দেয় নায়েব জীবন বাবু। আর এ টাকা দেওয়া একটা শিল্প কারখানার মালিকের জন্য কোন কষ্টকর বিষয় না, একের পর এক দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভালুকা  উপজেলা প্রশাসন তাকে বদলী করার সুপারিশ করে।
 সরেজমিনে ভালুকায় হবিরবাড়ী ও মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নে গিয়ে খোজ নিলে তার সম্পর্কে  যায়, নামজারি, জমাভাগ, খাজনা আদায়, জমির পর্চা (খসড়া) তোলা সহ ভূমি সংক্রান্ত সকল কাজে সরকার নির্ধারিত অর্থের বাইরেও বাড়তি টাকা নিতেন তিনি। চুক্তি ছাড়া কোন কাজ সম্পন্ন করেনি, আর চুক্তি অনুযায়ী টাকা না দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন সেবা পায়নি সেবাগ্রহীতারা। বাড়তি টাকা আদায়ের বাইরেও গ্রাহকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হয়রানির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে যে, নাযেব জীবন কুমার ভালুকায় থাকাবস্থায়  আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতাদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে বনে গেছেন কোটি-কোটি টাকার মালিক। গড়েছেন অঢেল সম্পদের পাহাড়। এছাড়াও ময়মনসিংহ শহরে জীবন বাবুর নিজস্ব একাধিক  দোকান পাট রয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তদন্ত করে জীবন বাবুর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। তাদের মতে,নায়েব জীবন কুমার  সরকারি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার খর্ব করছেন।
ময়মনসিংহ পৌর ভূমি অফিসে যোগ দেওয়ার পরও তার অপকর্ম বন্ধ হয়নি। এখানেও তিনি ঘুষের বিনিময়ে জনগণের কাজ দ্রুত সমাধান করে চলেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভূমি অফিসে ঘুষের রাজত্ব কায়েম করেই জীবন বাবু বর্তমানে জিরো থেকে হিরো হয়ে উঠেছেন।  তা না হলে এমন বিপুল পরিমাণ টাকা অর্জন কীভাবে সম্ভব হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
ময়মনসিংহ পৌর ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, এই অফিসের কর্মকর্তা জীবন বাবু  সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের তার চাহিদামত টাকার বিনিময়ে চুক্তির বাইরে কোন সেবা পাচ্ছেনা। তার এসব অনিয়ম যেনো দেখার কেউ নেই।
একটি সুত্র জানিয়েছে-জীবন বাবুর এক ভাগিনা তার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালালী করে বেড়ায়। কথা মতো কাজ করে না দিলে মামার প্রভাবে   ভাগিনা বিভিন্ন নায়েবদের মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি ও বদলী করে।
এব্যাপারে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জীবন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদ পত্রে সংবাদ প্রকাশ করা হলে নায়েব জীবন বাবু বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিনিধিকে সংবাদ  প্রকাশ না করার জন্য তদবির করে প্রতিনিধিকে হুমকি ও ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

সুবিধাবঞ্চিত অর্ধশতাধিক পথশিশুদের মাঝে ঈদের জামা দিয়ে হাসি ফুটালেন পলাশের পাপন

নরসিংদীর পলাশ বাসস্ট্যান্ড,ঘোড়াশাল রেলওয়ে স্টেশনে,কো-অপারেটিভ কলোনীসহ ঘোড়াশাল পৌর এলাকার বিভিন্ন