
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশল এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বিরোধীদের দুর্বল করা, গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের যে কৌশলে তিনি এত দিন সুবিধা পেয়েছেন, ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষের মুখে তা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের জনপ্রিয় নির্বাচিত নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। বৈশ্বিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন নেতা হিসেবেও তার ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সমালোচকদের অভিযোগ, মোদির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বিভক্ত ও দুর্বল হয়েছে, স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজের পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্দোলনের কর্মীরা কারাবন্দি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ মোদি সরকারের এই রাজনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংস পরিস্থিতির ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারের কঠোর শাসনপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তরুণদের আন্দোলনে বাড়ছে চাপ
দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ নতুন মাত্রা পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের আটক করার ঘটনা সরকারের সমালোচনা আরও বাড়িয়েছে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে নাগরিকদের প্রতিবাদ করার অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে মোদি সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কত দিন জনঅসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব?
পুরোনো কৌশল কি আর যথেষ্ট নয়?
মোদির রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি, বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর সরকারের প্রভাব। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত প্রতিবাদ এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোদির জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিরোধিতা মোকাবিলায় আরও কঠোর হওয়ার পরিবর্তে সরকারের সামনে জনঅসন্তোষের কারণগুলো সমাধান করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে।
রাজধানীর সাম্প্রতিক সহিংসতা ও বিক্ষোভ শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; বরং মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনারও একটি পরীক্ষা। জনসমর্থন ধরে রাখা, বিরোধীদের মোকাবিলা করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দেওয়া-এই তিনটি বিষয় এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা মোদির ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনৈতিক ছক ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মুখে কতটা টিকে থাকবে, তা এখন ভারতের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।





