লালমনিরহাটের অর্থনীতি পাল্টে দেবে মোগলহাট স্থলবন্দর

চার দশকেও চালু হয়নি লালমনিরহাটের মোগলহাট স্থলবন্দর। ১৯৮৮ সালে বন্যায় এটি বন্ধ হয়ে গেলে ভারত-বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করেও কোনো সুরাহা হয়নি। স্থলবন্দরটি আবার চালু হলে পাল্টে যাবে লালমনিরহাটের অর্থনীতি। কর্মসংস্থান হবে হাজার হাজার মানুষের।
লালমনিরহাট শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মোগলহাট। শহরের সঙ্গে মোগলহাটের সড়ক যোগাযোগ খুবই উন্নত। এক সময় ট্রেন যোগাযোগ ছিল। কিন্তু এখন তা বন্ধ। মোগলহাট থেকে ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার গিতালদহের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। মোগলহাট-গিতালদহ রুটের মাঝখানে ধরলা নদী। নদীর ওপর প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুও রয়েছে।
এক সময় মোগলহাটে ছিল স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। মোগলহাট-গিতালদহ রুটে নিয়মিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো এবং পাসপোর্টধারী যাত্রীরা চলাচল করতেন। ১৯৮৮ সাল পযর্ন্ত স্থলবন্দরের কার্যক্রম ছিল। ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের কার্যক্রম ছিল ২০০২ সাল পযর্ন্ত। এখনও ১১৭ শতাংশ জমির ওপর স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্মিত স্থাপনা রয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার কারণে মোগলহাট-গিতালদহ রুটে ধরলা নদীর ওপর সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে এই রুটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরের কার্যক্রম। তবে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট কার্যক্রম ২০০২ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
লালমনিরহাট জেলায় বুড়িমারী স্থলবন্দর থাকলেও সেটি শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে। দূরত্বের কারণে এখানকার ব্যবসায়ীরা বেশি সুবিধা ভোগ করতে পারেন না।
২০১৬ সালের ১৫-১৭ জুলাই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভূটান চারদেশীয় ব্যবসায়ীদের সভা অনুষ্ঠিত হয় ভারতের কলকাতা ও শিলিগুড়িতে। এতে মোগলহাট-গিতালদহ রুটে স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুনরায় চালুর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। চার দেশের ব্যবসায়ীরা এই রুটটি পুনরায় চালুর গুরুত্ব তুলে ধরেন। এই রুটটি পুনরায় চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্য, নেপাল ও ভূটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এতে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় লোকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এ বছরের ৪ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর নির্দেশনায় বাংলাদেশের স্থলবন্দর কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বন্দটি সম্ভাবণা যাচাইয়ের জন্য পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন মোগলহাট একটি ঐতিহাসিক স্থলবন্দর। একসময় এ পথ দিয়ে মানুষের যাতায়াত ও ব্যাপক বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালিত হতো। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী বন্দরটি পুনরায় চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং সরকারও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। তাই আজ আমি প্রাথমিকভাবে বন্দরটির অবস্থান, বিদ্যমান অবকাঠামো ও সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে এসেছি।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান জানান, মোগলহাট স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুনরায় চালুর জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশের স্থলবন্দর কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান বন্দটির সম্ভাবণা পর্যালোচনার জন্য পরিদর্শন করেছেন।
এ সময় তিনি বলেন, ধরলা নদীর ওপর ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি সংষ্কার অথবা নতুন করে নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে।
মোগলহাটের স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহআলম বলেন, এ বন্দরটি চালু হলে ব্যবসার ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে যাবো। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন চালু হলে আমরা খুব সহজেই ভারতে যাতায়াত করতে পারবো।
লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি শেখ আব্দুল হামিদ বাবু বলেন, মোগলহাট স্থলবন্দরটি চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে মাত্র। ব্রিটিশ আমল থেকেই মোগলহাট স্থলবন্দরটি চলমান থাকায় ভারতের কলকাতার সহজ যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। এটি বন্ধ থাকায় এখানকার লোকজন প্রায় চারশ কিলোমিটার ঘুরে কলকাতায় যাচ্ছেন।
মোগলহাট-গিতালদহ রুটটি ভারতের কোচবিহার, আসাম, নেপাল ও ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ রুট। এই রুট পুনরায় চালু হলে খুব সহজে ও কম খরচে ভারত ও ভূটান থেকে পাথর, কয়লা, ডলোচুনসহ পণ্য আমদানি করা যাবে। এতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। ফলে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন ঠিক তেমনি সরকারও রাজস্ব পাবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কয়েক হাজার মানুষের। যার ফলে পাল্টে যাবে লালমনিরহাটের অর্থনীতি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন