বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের প্রধান অলংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করা এখন দেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। বাঘকে টিকিয়ে রাখতে হলে আগে রক্ষা করতে হবে তার একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবনকে। বন ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, চোরা শিকার, বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন এবং আন্তর্জাতিক বাঘ পাচারকারী চক্রের তৎপরতা বন্ধ না করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো সুন্দরবনে বাঘ দেখার সুযোগ হারাবে।
বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার মিঠাখালী বাজারে অনুষ্ঠিত “সুন্দরবন বাঁচাও, বাঘ বাঁচাও” শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পশুর রিভার ওয়াটারকিপার, বাদাবন সংঘ ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
বক্তারা বলেন, ১৯৩০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার ১৭ জেলার মধ্যে ১১ জেলায় বুনো বাঘের বিচরণ ছিল। অথচ গত এক শতকে বিশ্ব থেকে প্রায় ৯৩ শতাংশ বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উনিশ শতকে বিশ্বের ৩৩টি দেশে প্রায় এক লাখ বাঘের অস্তিত্ব থাকলেও বর্তমানে মাত্র আটটি দেশে চার হাজারের কাছাকাছি বাঘ টিকে আছে। এই বাস্তবতা বিশ্বব্যাপী বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ধরা’র কেন্দ্রীয় নেতা ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার পরিবেশযোদ্ধা মো. নূর আলম শেখ। প্রধান অতিথি ছিলেন মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজসেবক ও ক্রীড়া সংগঠক শেখ রুস্তুম আলী, গোলাম রসুল, শাহ আলম শিপন, এম. রেজাউল ইসলাম, পরিবেশকর্মী নাজমুল হক, জানে আলম বাবু, গীতিকার মোল্লা আল মামুন, ছাত্রনেতা মঈন গাজী, আরাফাত দূর্জয়, পরিবেশযোদ্ধা মেহেদী হাসানসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।
সভাপতির বক্তব্যে মো. নূর আলম শেখ বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাঘ চোরাচালানকারী চক্র এখনও সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে। তারা বাঘ হত্যা করে দেহের বিভিন্ন অংশ বিদেশে পাচার করছে। এসব সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বন পাহারা আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বাঘের আবাসস্থলকে সংকুচিত করছে। তাই সুন্দরবন রক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণী হত্যা, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বনভূমি দখল, চোরা শিকার এবং শিল্পদূষণ বন্ধ না করলে শুধু বাঘ নয়, পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে পড়বে। বাঘ সংরক্ষণে সরকারের ঘোষিত টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথি আব্দুল মান্নান হাওলাদার বলেন, “রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় গর্ব, সাহস ও শক্তির প্রতীক। সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই এই সম্পদ সংরক্ষণ জরুরি।”
সমাজসেবক শেখ রুস্তুম আলী বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশযোদ্ধা মেহেদী হাসান অভিযোগ করে বলেন, প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এখনও সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে বন ধ্বংস, অবৈধ দখল এবং বন্যপ্রাণী নিধনের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আলোচনা সভার আগে মিঠাখালী ও চাঁদপাই বাজার এলাকায় বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্য, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। তারা বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকেলে মিঠাখালী মাঠে বাঘ ও সুন্দরবন সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ব্যতিক্রমধর্মী “বাঘ মহড়া” এবং একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচেরও আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের আশা, এমন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশবিদদের মতে, বাঘ টিকে থাকলে সুন্দরবন টিকে থাকবে, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে রক্ষা পাবে দেশের উপকূল, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। তাই বাঘ সংরক্ষণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, স্থানীয় জনগণ এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।




