দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বহুল আলোচিত দুলাল হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আবুল কালাম আজাদ ওরফে কালু। সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও কারাবিধির রেয়াত শেষে তিনি ভোলা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
কারাগার ও মামলার নথির সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের শান্তির হাট বাজার এলাকায় একটি ঘর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বিরোধ ও সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ওই সংঘাতের একপর্যায়ে গুলির ঘটনায় দুলাল নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত দুলালের ভাই মিলন মেম্বার বাদী হয়ে কালুকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত কালু ও তাঁর সহযোগী শাহাবুদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। সেই থেকে কারাগারই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ঠিকানা। কারাবিধি অনুযায়ী বন্দীর ভালো আচরণ, নিয়ম-কানুন প্রতিপালন এবং কাজের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্ত বিশেষ রেয়াত ও সাজা ভোগ শেষে অবশেষে আজ তিনি কারামুক্ত হন। জীবনের সেরা ২৭টি বসন্ত কাটিয়ে কালু যখন মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেললেন, তখন কারাফাটক পেরিয়ে নিজ ভিটায় ফেরার আনন্দ তার চোখে ম্লান হয়ে গেছে। দীর্ঘ এই দুই যুগেরও বেশি সময়ে চারপাশটা একেবারেই বদলে গেছে। কারাভোগের এই দীর্ঘ সময়ে একে একে চিরবিদায় নিয়েছেন তার দুই চাচা, ফুফু, মামাসহ প্রায় ১৫ জন নিকটাত্মীয়। যাদের স্মৃতি বুকে নিয়ে তিনি দীর্ঘ দিন কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে দিন কাটিয়েছেন, তাদের কাউকে আজ আর কাছে পাননি।
শুধু স্বজনহারার বেদনা নয়, সময়ের নিষ্ঠুর ছাপ পড়েছে তার পারিবারিক জীবনেও। কারাগারে যাওয়ার সময় তরুণী স্ত্রীকে রেখে গেলেও আজ তিনি জীবনসংগ্রামের ঝড়ে বৃদ্ধা। সেদিনের সেই অবুঝ শিশুকন্যাটি আজ নিজে সন্তানের মা। কোলজুড়ে থাকা এক সন্তানকে নিয়ে কালুর স্ত্রী দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে যে একাকী সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার চেহারার বলিরেখায়।
মুক্তির পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কালু বলেন, “অপরাধ যাই হোক, জীবনের সব আলো কারাগারে শেষ হয়ে গেছে। আজ মুক্ত, কিন্তু আমার আপন বলতে আর অনেকেই নেই। কাকে গিয়ে দেখব, সেই ঘর-ভিটাই তো খালি।” তবে জীবনের বাকি দিনগুলো সবার মাঝে সুস্থভাবে কাটিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন।
একটি রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক ও পারিবারিক বিরোধ কীভাবে একটি মানুষের জীবন থেকে ২৭টি বছর কেড়ে নিতে পারে, আবুল কালাম আজাদ ওরফে কালুর এই ফেরা তারই এক করুণ ও বাস্তব দলিল।