ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই মাস ধরে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা কমছে না। জ্বালানি সরবরাহের ধমনিখ্যাত এ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল ও সারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এ নৌপথ বন্ধ থাকায় যেমন বাইরে থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোয় খাবার যেতে পারছে না, তেমনি সেখান থেকে সার ও জ্বালানি অবাধে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এতে চলতি চাষাবাদ মৌসুমে সারের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে দেখা দিচ্ছে সার সংকট। জ্বালানির অভাবে কৃষক সেচ দিতে পারছে না। যার সার্বিক প্রভাব পড়ছে গিয়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনায়। তাতে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে খাবারের দাম। হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দেবে। কোটি কোটি মানুষকে অনাহারে থাকতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবির
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন এবং সৌদি আরবের মতো আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য আমদানি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। সিগনাল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, অ্যামোনিয়া, ফসফেট ও সালফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সারের বৈশ্বিক সরবরাহের ২০ শতাংশের জোগান দেয় এই কয়েকটি দেশ। ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া যায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যার মধ্যে এক-দশমাংশ যায় কাতার থেকে।
মার্চের শুরুর দিকে ইরানের হামলার পর বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি এবং সারের কেন্দ্রস্থল রাস লাফানে উৎপাদন বন্ধ করে দেয় কাতারএনার্জি। এর ফলে লাখ লাখ টন সারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে সার উৎপাদন ব্যাহত হবে, জ্বালানি ঘাটতি দেখা দেবে। কৃষকরা ঠিকমতো সার পাবেন না, খরচ বাঁচাতে তারা কম সার দেবে। ফসল উৎপাদন কম হবে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হলে সংকট দেখা দেবে, ফলে আরও লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান জুন পর্যন্ত চলতে থাকলে, তা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে চরম খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি)।
করোনা মহামারি এবং রাশিয়া ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত কৃষিজমি এবং বন্দর দখল করার পর গত ছয় বছরের মধ্যে ইরানের কারণে যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা তৃতীয় বড় ঝুঁকির হুমকি। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারের দাম ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তবে রাশিয়ার ট্যাংক ইউক্রেনে প্রবেশের পরের সপ্তাহগুলোর তুলনায় এখনো অবশ্য তা প্রায় ৪০ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি ও দোকানের তাকে থাকা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকায় সংঘাতের প্রকৃত প্রভাব এখনো অনুভূত হয়নি। তারা আরও একমত, ক্ষতির তীব্রতা মূলত নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে, নৌপরিবহন কতদিন বাধাগ্রস্ত থাকবে, তার ওপর। এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তেলের এক-চতুর্থাংশ যায়।
জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন আঙ্কটাডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারের ঘাটতি দেখা দিলে বৈশ্বিক ফসল উৎপাদনে তার ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। প্রতি মাসে হরমুজ দিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন টন সার রপ্তানি করা হয়। তাই ৩০ দিন হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা হলে ভুট্টা, গম এবং চালের মতো নাইট্রোজেননির্ভর ফসলের ঘাটতি এবং ফলনের ঝুঁকি বাড়বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি যত বেশিদিন বাণিজ্যিক পরিবহন থেকে দূরে থাকবে, বিশ্বব্যাপী সার সরবরাহ তত বেশি ব্যাহত হবে এবং তাতে সংকটও বাড়তে থাকবে। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক মাতিন কাইম আলজাজিরাকে বলেন, আগামী মাসগুলোয় খাদ্যমূল্য অবশ্যই বাড়বে, যা বিশ্বের অনেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা আরও কঠিন করে তুলবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনে খরচ করে। ক্ষুধা ও অপুষ্টি খুব সম্ভবত বাড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে এ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট বৈশ্বিক খাদ্য ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে। এফএও আরও বলছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া, সুদান, তানজানিয়া, কেনিয়া ও মিশর। গত মাসে এক বিশ্লেষণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, সংঘাত যদি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তা হলে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৪ কোটি) বা তারও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
এখন পর্যন্ত যুদ্ধ খাদ্যমূল্যকে শুধু পরিমিতভাবেই প্রভাবিত করেছে, যা কিছু পর্যবেক্ষককে অবাক করেছে। এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় গত মাসে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
তেল ও সারের বর্ধিত দাম খাদ্য উৎপাদন খরচ বাড়ালেও বিশ্বে এখন যে খাদ্য খাওয়া হচ্ছে, তার বেশিরভাগ উৎপাদিত হয়েছিল যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে। বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনও এর আগে কখনো এত বেশি ছিল না। এফএওর পূর্বাভাস, ২০২৬ কৃষি মৌসুম শেষে শস্যের মজত রেকর্ড ৯৫ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। মূল সংকট শুরু হবে কয়েক মাস পর থেকে।
ইতালির লেচ্চের থিংক ট্যাংক ফন্ডাজিওন সিএমসিসির গবেষক শৌরো দাশগুপ্ত বলেছেন, জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর তৈরি সমষ্টিগত মূল্যসূচকে দরিদ্র দেশের বহু পরিবার পড়ে না। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, অনেক নিম্নআয়ের দেশে জ্বালানি মূল্য সরাসরি খুচরা খাদ্যমূল্যে প্রভাব ফেলে, কারণ উচ্চ আয়ের দেশের তুলনায় সেখানে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিবহন খরচের অংশ অনেক বড়। তাই চলতি বছর বাড়তি জ্বালানি খরচ ঢাকা, কায়রো ও লাগোসে খাদ্য বাজেটকে প্রভাবিত করছে। তিনি আরও বলেন, খাদ্যমূল্য বাড়লে পরিবারগুলো প্রায়ই ফল, শাকসবজি ও প্রোটিন থেকে সরে গিয়ে সস্তা, ক্যালরিসমৃদ্ধ প্রধান খাবারের দিকে ঝুঁকছে। যার দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি হয় অপুষ্টি।
যুদ্ধের বিলম্বিত প্রভাব ও হরমুজ প্রণালি ফের খোলার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও বর্তমান সম্ভাবনার তীব্রতা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা একমত নন। খাদ্যশস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক চুক্তিকারী এবং যারা কেনাবেচা করেন, তারা আগামী মাসগুলোয় শুধু পরিমিত মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে গম ও ভুট্টার ফিউচার্স বছরের শেষ নাগাদ ৪ থেকে ৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদিও কিছু দিক থেকে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থায় আগেকার অন্যান্য বড় ধাক্কার তুলনায় বিশ্ব বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বেশ ভালো অবস্থানে আছে। ২০০৭-০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময়, যখন বৈশ্বিক গমের দাম ১৩৫ শতাংশের বেশি লাফিয়েছিল, তখন চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইউক্রেনসহ অসংখ্য দেশ প্রধান ফসল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অর্থনীতিবিদরা বলেন, সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা মূলত খরা, কম শস্যমজুত ও তেলের বাড়তি মূল্যের সংমিশ্রণে শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়।
বর্তমান যুদ্ধের সময় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার তেমন কোনো তাড়া দেখা যায়নি। তবে ইরান ও কুয়েত যারা বিশ্বব্যাপী প্রধান খাদ্য সরবরাহকারী নয়, তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের পরিবেশ অর্থনীতির অধ্যাপক এলিজাবেথ রবিনসন আলজাজিরাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। শস্যের বাজার বিঘ্নিত হচ্ছে না এবং দেশগুলো ২০০৮ সালের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। তাই সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে খাদ্যমূল্যে তীব্র উল্লম্ফন হবে বলে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
লন্ডনের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো স্টিভ উইগিনস বলেন, নেতিবাচক পূর্বাভাসগুলো বাজারের ধাক্কা সামঞ্জস্যের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, সারা বিশ্বে কৃষি বৈচিত্র্যময় ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কৃষকরা ইনপুটের প্রাপ্যতা ও মূল্যের পরিবর্তন, আউটপুট মূল্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ইত্যাদির প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের উৎপাদন ব্যবস্থা সামঞ্জস্যে দক্ষ।
ফলনের পরিমাণ কমতে পারে: তবে হরমুজ প্রণালি যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, সালফার ও ফসফেটের দাম তত বাড়তে পারে। যার অর্থ কৃষকদের জন্য বাড়তি খরচ। এফএও অনুমান করছে, সংকটের সমাধান না হলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সারের দাম গড়ে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে। সাপ্তাহিক ছুটিতে সামান্য বাড়ার পর প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচল আবার নামমাত্রে নেমে এসেছে। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন ইরানি বন্দর অবরোধ রাখবে, ততদিন জাহাজ চলাচল সীমিত থাকবে।
সোমবার ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, বুধবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, একটি ‘খারাপ চুক্তি’ করতে তিনি তাড়াহুড়ো করবেন না।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারা ক্যাম্পাসের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্যাথি বেলিস যিনি জর্জ ডব্লিউ বুশের হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, কিছু দেশে শিগগির বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখলে তিনি অবাক হবেন না। তিনি আলজাজিরাকে আরও বলেন, আমরা মার্চে খাদ্যমূল্য কিছুটা বেড়ে যেতে দেখেছি, কিন্তু আমি কল্পনা করছি এপ্রিলের সংখ্যাগুলো আরও খারাপ হবে। আমার নজর থাকবে এ বসন্তে প্রধান ফসলের রোপিত এলাকা কমে যায় কি না, যা বাড়তি ইনপুট মূল্যের সম্ভাব্য এক প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করবে। আবার রোপিত এলাকা স্থিতিশীল থাকলেও, ইনপুট ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে ফলনের পরিমাণ কমতে পারে।




