জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে সামাজিক মাধ্যমে এআই এনহ্যান্সড প্রযুক্তিতে উন্নত করা স্থিরচিত্র সরবরাহ করাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১২ মে ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ভুক্তভোগী এবং কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে শনাক্ত করেন। তবে সে সময় সাংবাদিকদের ফুটেজ দেখতে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তথ্য সংগ্রহে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক অসহযোগিতার শিকার হন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গ্রুপে অভিযুক্তের একটি এআই-জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এই ছবিই অনেক সাংবাদিকের কাছে সরবরাহ করা হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকৃত সিসিটিভি ছবির পরিবর্তে ওই কৃত্রিমভাবে উন্নত করা ছবি প্রকাশিত হয়। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সংশোধনী বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান, ইতিহাস বিভাগের ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী লামিসা জামানের নেতৃত্বে কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে বাধা দেন। একই সঙ্গে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম ও একজন সহকারী প্রক্টরের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সাংবাদিকদের দূরে রাখা হয়। এ সময় লামিসা জামান এনহ্যান্সড প্রযুক্তিতে উন্নত করা বিভ্রান্তিকর স্থিরচিত্রটি সাংবাদিক, প্রশাসন ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এ সময় লামিসাকে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্কসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করতে দেখা যায়।
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রক্টর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে কিছু মূল সিসিটিভি স্থিরচিত্র সরবরাহ করেন। গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, এসব ছবির সঙ্গে আগে প্রচারিত এআই এনহ্যান্সড ছবির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, মূল ছবি গোপন রেখে এআই এনহ্যান্সড ছবি সরবরাহের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে শুধু ক্যাম্পাসেই নয়, সারা দেশেই অভিযুক্তের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এমনকি ঢাকা জেলা পুলিশও তাদের ফেসবুক পোস্টে ওই এআই এনহ্যান্সড ছবি ব্যবহার করে তথ্যদাতার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর একদল নারী শিক্ষার্থী প্রশাসনের কাছে দাবি করেন যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ফলে সাংবাদিক ও জাকসুর প্রতিনিধিরা প্রথমদিকে ভেতরে যেতে পারেননি। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর সীমিতভাবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটিই ব্যবহার করে অনেক সংবাদ প্রকাশিত হয়।
জাকসুর সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বাপ্পি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এআই-জেনারেটেড ছবিতে অভিযুক্তের চেহারা এবং পরিহিত মাদ্রিদের জার্সির নকশাও পরিবর্তন করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগীর দোহাই দিয়ে সাংবাদিক ও জাকসু প্রতিনিধিদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে না দিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ঘটনার পেছনে বড় কোনো ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে লামিসা জামানের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তার ফোন বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি অভিযোগের বিষয়ে অন্য এক গণমাধ্যমকে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের চলাচলের কারণে ছবি স্পষ্ট ছিল না। তাই কয়েকটি স্থিরচিত্র পরিষ্কার করে ভুক্তভোগীকে দেখানো হয়। ভুক্তভোগী যে ছবিটিকে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে বলে শনাক্ত করেন, সেটিই তিনি সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাউকে এআই এনহ্যান্সড ছবি দেওয়া হয়নি। পুলিশ প্রশাসনকে মূল সিসিটিভি ফুটেজই সরবরাহ করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও আগে মূল ছবি প্রকাশ করা হলে ভালো হতো।




