হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার গভীর অরণ্যে অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে আবারও মূল্যবান সেগুনগাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। বন বিভাগের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র গত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রাতের আঁধারে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি শতবর্ষী সেগুনগাছ কেটে পাচার করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এই বনাঞ্চলে নিয়মিতভাবে গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত। ফলে সাতছড়ির প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে মিলল কাটা গাছের গোড়া, করাতের গুঁড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
গত শুক্রবার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ডুমুরতলা এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল আকৃতির দুটি সেগুনগাছ কেটে নেওয়া হলেও পড়ে আছে মোটা গোড়া এবং চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে করাতের গুঁড়া।
সেখান থেকে আরও পূর্ব-দক্ষিণ দিকে এগোলে একই ধরনের আরও দুটি বড় গাছ কাটা অবস্থায় দেখা যায়। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে পাওয়া যায় অসংখ্য গাছের কাটা গোড়া—যা যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে বন উজাড়ের।
স্থানীয় বাসিন্দা: “পুরো বন ঘুরলে অন্তত ২৫-৩০টা কাটা গাছ পাওয়া যাবে”
বনের ভেতরে কথা হয় স্থানীয় এক ভিলেজারের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রায় ৪৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি জানান,
“পুরো বন ঘুরে দেখলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টা কাটা গাছ পাওয়া যাবে। শুধু দুই-তিন দিনেই কাটা হয়েছে। আগেও অনেক গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এখনও পুরোনো শিকড় পড়ে আছে ফাঁকে ফাঁকে।”
তার মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি বড় চক্রের কাজ।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান: জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়
প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ২০০৫ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বনাঞ্চলে রয়েছে সাতটি প্রাকৃতিক ছড়া, যেখান থেকে উদ্যানটির নামকরণ।
এখানে বাস করে উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনরুইসহ নানা বিরল প্রাণী। এছাড়া শতবর্ষী সেগুন, গর্জন, চাপালিশ, করই ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ বনকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব।
অভিযোগ: কাঠচোর সিন্ডিকেটের পেছনে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছ চুরির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের অভিযোগ,
এই চক্রে শুধু কাঠচোররাই নয়—বন বিভাগের অসাধু কর্মচারী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও জড়িত থাকতে পারে।
একাধিক বাসিন্দা বলেন,
“সবাই মিলে মিশেই বনটাকে শেষ করে দিচ্ছে। না হলে এত বড় গাছ কেটে নেওয়া সম্ভব না।”
পরিবেশবাদী নেতা: “একটি গাছ কাটা মানে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস”
পরিবেশবাদী নেতা তোফাজ্জল সোহেল বলেন,
“একটি বড় গাছ কাটা মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণীর বাসস্থান, পাখির আশ্রয়, মাটির আর্দ্রতা ও বনজ পরিবেশের ভারসাম্য।”
তিনি আরও বলেন,
“এভাবে গাছ কাটা চলতে থাকলে সাতছড়ির জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। বন ধ্বংস হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হবে, কমবে বৃষ্টিপাত, বাড়বে ভূমিক্ষয় এবং বিলুপ্ত হবে অনেক বন্যপ্রাণী।”
আগেও ঘটেছিল চুরি, কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বেড়েছে সাহস
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এর আগেও একই ধরনের গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৮ জুন “সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সেগুনগাছ কেটে নিল দুর্বৃত্তরা” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বনখেকো চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বন বিভাগের বক্তব্য: মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে
এ বিষয়ে সাতছড়ি রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন,
“দুটি সেগুনগাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ কিছুটা শনাক্ত করতে পেরেছে কারা জড়িত থাকতে পারে।”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, তিনি সরকারি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তাকে জানানো হয়নি। তবে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন,
“বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাতছড়ি রক্ষায় দ্রুত অভিযান ও কঠোর শাস্তির দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবিদরা বলছেন, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান শুধু হবিগঞ্জ বা চুনারুঘাটের সম্পদ নয়—এটি দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দ্রুত অভিযান চালিয়ে কাঠচোর সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।




