
সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা, জেলে-বাওয়ালি-মৌয়ালদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং দস্যুদের স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে কথিত ‘টোকেন বাণিজ্য’ চালানোর অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে বনজীবীদের মধ্যে। জীবিকার তাগিদে বনে প্রবেশের আগেই দিতে হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আর কথিত টোকেন ছাড়া বনে প্রবেশ করলে দস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা, বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দস্যুদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবিতে খুলনার কয়রায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় উপজেলার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের সামনে সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীর তীরে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের উদ্যোগে এবং কয়রা উপজেলা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মসূচিতে বনজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, গত দুই বছর ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যু বাহিনীর তৎপরতায় জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে যাওয়া বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় কিছু মাছ ব্যবসায়ী ও দস্যু সহযোগী চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
বক্তাদের দাবি, বনদস্যুদের স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে দুই ও পাঁচ টাকার নোটের নম্বরকে বিশেষ সংকেত বা টোকেন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার পর বনজীবীদের ওই টোকেন সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার নামে অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। টোকেন ছাড়া বনে গেলে দস্যুদের হাতে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
মানববন্ধনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, সুন্দরবনে দস্যুদের অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও অন্যান্য রসদ সরবরাহ করছে কারা? কারা লোকালয় থেকে দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহ করছে? এসব সহযোগীকে শনাক্ত না করে শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালালে দস্যুতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
কর্মসূচির উদ্বোধনী বক্তব্যে উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বনদস্যুদের কারণে হুমকির মুখে। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা জীবিকার জন্য বনে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শুধু বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই হবে না, তাদের স্থানীয় সহযোগী, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহকারী এবং মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি সুন্দরবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান জোরদারের দাবি জানান।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠনের উপদেষ্টা আ ব ম আব্দুল মালেক, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কয়রা উপজেলা সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা এম আনোয়ার হোসেন, কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি সহকারী অধ্যাপক বিদেশ রঞ্জন মৃধা, কয়রা উপজেলা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরোর কয়রা উপজেলা শাখার সহসভাপতি জিএম মোনায়েম, কয়রা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন ও বনজীবী মুছানুর রহমান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বনদস্যুদের ভয়ে বনজীবীদের জীবিকা নির্বাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়বে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার পরিবারের ওপর। দস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মুক্তিপণ আদায়ের চক্র, কথিত টোকেন বাণিজ্য এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
তাঁরা আরও বলেন, সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের একক দাবি নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। এ দাবিতে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
মানববন্ধন থেকে সুন্দরবনে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান, অপহৃত বনজীবীদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহকারী চক্র শনাক্ত, কথিত টোকেন বাণিজ্য বন্ধ এবং দস্যুদের স্থানীয় সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
কর্মসূচিতে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, কাঁকড়া ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।




