কমলগঞ্জে আগাম বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে ২২টি চা বাগানে, আশায় বুক বাঁধছেন সংশ্লিষ্টরা

 কমলগঞ্জ উপজেলায় আগাম বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে উপজেলার ২২টি চাবাগান। দীর্ঘদিনের খরার পর বৃষ্টির ছোঁয়ায় চাগাছে ফিরেছে সবুজ সতেজতা। চাশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সময়ের বৃষ্টি চাগাছের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই গাছে নতুন কুঁড়ি গজাতে শুরু করবে এবং মৌসুমের শুরুতেই চাপাতা সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ মার্চ থেকে ১৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত মোট ৪৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই দিনও এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চাবাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় তিন মাস আগে উপজেলার বিভিন্ন চাবাগানে চাগাছ ছাঁটাই বা প্রুনিং কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণত শীত মৌসুমের শুরুতে এই ছাঁটাই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে নতুন কুঁড়ি ও পাতা গজাতে পারে। তবে ছাঁটাইয়ের পর কিছুদিন বাগানগুলোতে রুক্ষ ও শুষ্ক পরিবেশ দেখা দেয়। চাগাছে নতুন পাতা ও কুঁড়ি গজানোর জন্য পর্যাপ্ত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক চাবাগানে কৃত্রিমভাবে সেচের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হয়েছে।

এ অবস্থায় হঠাৎ হওয়া বৃষ্টি চা বাগানের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বৃষ্টির পানিতে চাগাছের ওপর জমে থাকা ধুলাবালি ধুয়ে গিয়ে গাছগুলো আবারও সবুজ ও সতেজ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে পোকামাকড়ের আক্রমণও অনেকাংশে কমে যায়, যা চাগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখে।

চাবাগান সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এই বৃষ্টি চাউৎপাদনের জন্য ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে। কারণ বৃষ্টির পরপরই চাগাছে দ্রুত নতুন কুঁড়ি বের হতে শুরু করবে। এতে মৌসুমের শুরুতেই চাপাতা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর, পদ্মছড়া, আলীনগর, সুইনছড়া, পাত্রখলা, শমশেরনগর ডানকান, মৃর্তিঙ্গা ও চাম্পারাইসহ বিভিন্ন চাবাগান ঘুরে দেখা যায়, আগাম বৃষ্টির ছোঁয়ায় চাগাছগুলো আবারও সতেজ হয়ে উঠেছে। কয়েকদিন আগেও ছাঁটাই করা গাছের কারণে বাগানজুড়ে কিছুটা রুক্ষ ও শুষ্ক পরিবেশ বিরাজ করছিল। কিন্তু বৃষ্টির পর সেই পরিবেশ বদলে গিয়ে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে চাবাগানগুলো।

শমশেরনগর চাবাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন বলেন, “বৃষ্টির অভাবে বছরে প্রায় তিন থেকে চার মাস চা উৎপাদন করা যায় না। গত দুই দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, এতে চাগাছের অনেক উপকার হবে। এখন গাছ থেকে নতুন কুঁড়ি বের হবে। আশা করছি, আগাম বৃষ্টির কারণে এবার চা উৎপাদন ভালো হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুমের শুরুতেই চাপাতা সংগ্রহ শুরু করা যাবে।”

বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিসিএস) সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও ফিনলে চা ভাড়াউড়া ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, “দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় চাবাগানগুলোতে কিছুটা শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করছিল। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে এবং বাগানগুলোতে আবার সজীবতা ফিরে এসেছে। বিশেষ করে নতুন চাগাছ এবং প্রুনিং করা গাছগুলোর জন্য এই বৃষ্টি খুবই উপকারী।”

তিনি আরও বলেন, “যদি আগামী দিনগুলোতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে খুব দ্রুত চাপাতা চয়ন শুরু করা সম্ভব হবে। এতে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমও দ্রুত শুরু করা যাবে এবং চলতি মৌসুমে চা উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

স্থানীয়রা জানান, আগাম বৃষ্টির ফলে শুধু চাবাগান নয়, পুরো এলাকার পরিবেশেও স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘদিনের শুষ্কতা ও ধুলাবালির পর প্রকৃতিতে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। চাশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও উদ্যোক্তারা এখন আশাবাদী যে এই বৃষ্টি চলতি মৌসুমে চা উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন