খুলনার কয়রা উপজেলার বেদকাশী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে একের পর এক অর্থবছরে একই এলাকার সড়ক এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড) করণ করা হলেও নির্মাণকাজের মান নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট, কাঁদাযুক্ত বালু ও যথাযথভাবে কাজ না করার কারণে সরকারি অর্থে নির্মিত এসব সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, একই এলাকায় চার অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৪ কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এর আগে একই এলাকার একটি এইচবিবি সড়কের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বাংলা নিউজ২৪-এ ‘কয়রায় ৮৪ লাখ টাকার দায়সারা কাজ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে নিম্নমানের ইটসহ নির্মাণকাজের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। কিন্তু সেই অভিযোগের পরও একই এলাকার পরবর্তী প্রকল্পে ফের নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজের জন্য ট্রাকে করে কয়েক হাজার ইট আনা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ইট নিম্নমানের। বৃষ্টিতে ভিজে ইটের গায়ের রং কিছুটা লালচে দেখা গেলেও পোড়ের মান ছিল দুর্বল।
ইট নামানোর দায়িত্বে থাকা শরিফুল ইসলাম অবশ্য স্থানীয়দের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “মেম্বারসহ স্থানীয় কয়েকজনকে ইটের স্যাম্পল দেখানোর পর পছন্দ হওয়ায় এগুলো আনা হয়েছে। আগে যে ভাটা থেকে ইট নেওয়া হচ্ছিল, সেখানে আর এক নম্বর ইট না থাকায় অন্য ভাটা থেকে আনা হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজের শুরুতে নিম্নমানের ইট আনা হলে প্রতিবাদের মুখে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে কিছুদিন মানসম্মত ইট দিয়ে কাজ করার পর আবারও নিম্নমানের ইট এনে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।
এ ছাড়া রাস্তার সাবগ্রেড তৈরিতে এবং এইচবিবি সড়কের ওপর কাঁদাযুক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে, নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য রাস্তার পাশের একটি মৎস্য খামার থেকে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করে রাস্তার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
জানা যায়, ওই খামার থেকে বালু সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু হাসান। তিনি প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ঠিকাদারের কাছ থেকে ১৫ টাকা করে নিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পের শুরু থেকেই ওই ইউপি সদস্য নির্মাণকাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া সড়কটি নির্মাণের আগে সেখানে ইটের সোলিং ছিল। সেই সোলিংয়ের ইট তুলে ইউনিয়ন পরিষদে জমা না দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন ওই ইউপি সদস্য।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইউপি সদস্য আবু হাসান বলেন, “সোলিংয়ের ইট একত্রিত করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার মাঠে রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সবাই বিষয়টি জানেন। রেজুলেশনের মাধ্যমে পরে অন্য একটি সরকারি কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।”
স্থানীয়দের আরেকটি অভিযোগ, বর্তমান সড়কটি নির্মাণের আগে ওই স্থানে ইটের সোলিং ছিল। নতুন করে এইচবিবি সড়ক নির্মাণের সময় সেই পুরোনো সোলিংয়ের ইট তুলে নেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে ইউনিয়ন পরিষদের হেফাজতে দেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, ওই ইট পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে রেখে দেওয়া হয়েছে এবং এর ব্যবস্থাপনায় ইউপি সদস্য আবু হাসানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
তবে ইউপি সদস্যের দাবি, ইটগুলো স্থানীয় একটি মাদ্রাসার মাঠে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে সরকারি কাজে ব্যবহার করা হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে একই এলাকার সড়ক নির্মাণের ধারাবাহিকতা নিয়ে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বেদকাশি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে—২০২২/২৩ অর্থ বছরে কাশিরখাল ধার থেকে মজিবরের ব্রিজ হয়ে জিয়াদ গাজীর বাড়ি অভিমুখে ১ হাজার মিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণ করা হয়।
২০২৩/২৪ অর্থ বছরে জিয়াদ গাজীর বাড়ি থেকে জিলিয়াঘাটা বাজার অভিমুখে আরও ১ হাজার মিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়।
২০২৪/২৫ অর্থ বছরে বতুল বাজারের মজিবরের ব্রিজ থেকে পশুরতলা আদিবাসী পাড়া অভিমুখে আরও ১ হাজার মিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণ করা হয়।
২০২৫/২৬ অর্থ বছরে বতুল বাজারের মোসলেম মোড়লের বাড়ি থেকে মৃত্যুঞ্জয় মুন্ডার বাড়ি অভিমুখে আরও ১ হাজার মিটার এবং মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের আরও ৫০০ মিটারসহ মোট দেড় কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
পরপর চার অর্থবছরে বেদকাশি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডকেন্দ্রিক এলাকায় প্রায় ৪ কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কয়রা উপজেলার আরও বহু জনগুরুত্বপূর্ণ ও যোগাযোগবঞ্চিত সড়ক থাকা সত্ত্বেও একই এলাকার সড়কেই কেন প্রতি অর্থবছরে নতুন করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে?
প্রতিটি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের সময় পূর্ববর্তী প্রকল্পের অবস্থান, উপকারভোগীর সংখ্যা, সড়কের ব্যবহার এবং প্রকৃত জনস্বার্থ যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০২৫/২৬ অর্থবছরে উত্তর বেদকাশী ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে মোট দেড় কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্ত পেমেন্ট সার্টিফিকেটে প্রকল্পের চুক্তিমূল্য হিসেবে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ টাকা ৬৬ পয়সা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে প্যাকেজ নম্বর এইচবিবি ডব্লিউডি ২৬৮, টেন্ডার আইডি ১২৪৩৮৯২ এবং চুক্তি নম্বর এইচবিবি ডব্লিউডি ২৬৮/২০২৫-২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের একটি অংশ হলো উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বতুল বাজার মোসলেম মোড়লের বাড়ি থেকে মৃত্যুঞ্জয় মুন্ডার বাড়ি অভিমুখে ১ হাজার মিটার এইচবিবি সড়ক। অপর অংশটি মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সাতখালিয়া বাজার গাজীর মোড় থেকে জামাত গাইনরের বাড়ি অভিমুখে ৫০০ মিটার।
পেমেন্ট সার্টিফিকেটে প্রকল্পের কাজ পরিমাপ বই অনুযায়ী যাচাই করে বিল পরিশোধের প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজের মান নিয়ে আবারও অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কাগজে-কলমে পরিমাপ ও বিল যাচাইয়ের পরও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কাজ শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল ২৮ এপ্রিল এবং ১০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে কাজের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।
কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স হাজী এন্ড সন্স কর্পোরেশন।
সরকারি প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে প্রকল্পের নাম, বরাদ্দ, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান, কাজের সময়সীমাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করে নির্ধারিত আকারের সাইনবোর্ড স্থাপনের কথা থাকলেও সরেজমিনে প্রকল্পের প্রারম্ভিক স্থানে এমন সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।
ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকল্পের মোট ব্যয়, কাজের পরিমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম সরদার বলেন, “ওই রাস্তার বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। হাসান মেম্বারই সবকিছু দেখাশোনা করছেন। আমি শুনেছি ওই এলাকার মানুষ অভিযোগ করছে—ইট ভালো না, বালু ভালো না, কাজের মান ভালো না।”
তিনি আরও বলেন, “ওই রাস্তাটার পরিকল্পনা ছিল জিলিয়াঘাটা হয়ে বতুল বাজার, পাথরখালী সুইসগেট পর্যন্ত করার। কিন্তু তা না করে হাসান মেম্বার কীভাবে কী করে তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে নিয়ে গেছে। ওইটা একটা ঘরোয়া রাস্তা—গাড়ি চলে না, তেমন কিছু চলে না। শুধু দুইটা মোটরসাইকেল চলে—একটা হাসান মেম্বারের আর একটা আইয়ুব শেখের।
পুরোনো সোলিংয়ের ইটের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “আমি কিছু জানি না কী দিয়ে কী করেছে। পরে শুনেছি ওই ইট তাঁর বাড়ির সামনে একটি মসজিদের মাঠে রাখা হয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, কাজের শুরুতে নিম্নমানের ইট আনা হয়েছিল। সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়। পরে মানসম্মত ইট এনে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। তবে পুনরায় নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
বালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই এলাকার এইচবিবি সড়ক নির্মাণ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলা নিউজ২৪-এর ‘কয়রায় ৮৪ লাখ টাকার দায়সারা কাজ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ২০২৪/২৫ অর্থবছরের বতুল বাজার মজিবরের ব্রিজ থেকে পশুরতলা আদিবাসী পাড়া অভিমুখে ১ হাজার মিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।
ওই প্রকল্পে প্রায় ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি করার কথা ছিল এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জয়নগর, দাকোপের মীরাজ মীরা অ্যান্ড কোং-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
এরপরও একই এলাকার পরবর্তী প্রকল্পে নিম্নমানের ইট ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—আগের অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী শিক্ষা নিয়েছে এবং আগের প্রকল্পের কাজের মান আদৌ যাচাই করা হয়েছিল কি না।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বর্তমান প্রকল্পের ইট-বালুর মান পরীক্ষা করলেই হবে না। গত চার অর্থবছরে একই এলাকায় নেওয়া এইচবিবি প্রকল্পগুলোর প্রকল্প অনুমোদন, ডিপিপি/প্রকল্প প্রস্তাব, প্রাক্কলিত ব্যয়, দরপত্র, কার্যাদেশ, চুক্তিমূল্য, ঠিকাদারের নাম, পরিমাপ বই , বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাণ, পূর্বের সড়কের অবস্থা এবং পুরোনো সোলিংয়ের ইটের হিসাব একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ বা প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে কি না।
সরকারি অর্থে নির্মিত সড়ক যদি কয়েক বছর পরপর একই এলাকায় নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পুনরায় নির্মাণ করতে হয়, তাহলে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
