কুমারখালীতে নির্মাণাধীন ড্রেনেজে ডুবে শিশুর মৃত্যু, বাবা – মা অসুস্থ

নির্মাণাধীন ড্রেনে প্রাণ গেল শিশুর
‘ ওরে বুকে ধরি কি শান্তি, বুকি ধরবরে’
‘ ওহ আমার কোলে দেন, বুকি ধরবরে, বুকে ধরে কি শান্তি’
মোঃ নয়ন শেখ কুমারখালী
ড্রেনেজ নির্মাণের জন্য প্রায় একবছর আগে করা হয়েছে খনন। তবে এতোদিনেও সেখানে শুরুই হয়নি ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ। আর সেখানে জমে থাকা পানিতে পড়ে এক শিশু মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আজ সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের এলংগী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুর নাম মো. ইফাদ (৬)। সে ওই এলাকার লুঙ্গী ব্যবসায়ী কামরুল হাসানের ছোট ছেলে ও স্থানীয় বাইতুল উলুম ইসলামিয়া ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আর আদরের সন্তান হারিয়ে মা শারমিন আক্তার পাগলপ্রায়। অসুস্থ হয়ে শিশুটির বাবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, একবছরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। কোথাও আবার খনন করা হলেও কাজ শুরুই হয়নি। খনন করা অংশে পানি জমে মৃত্যকূপে পরিনিত হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় অকালেই ঝরল ইফাতেরের প্রাণ। দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তাঁরা।
পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, কুমারখালী পৌরসভার ৩ নং নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক কর্মকর্তা মানিক শেখের বাড়ি থকে গড়াই নদী পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার ড্রেনেজ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। গত বর্ষা মৌসুমে ড্রেনেজ নির্মাণের উদ্দেশ্যে মাটি ভেক্যু দিয়ে সরু খাল সৃষ্টি করেছে ঠিকাদার। তবে একবছরেরও নির্মিণ কাজ শুরু না হওয়ায় মানিকের বাড়ির সামনে ছোট খাদে পরিনিত হয়েছে।
আরও জানা গেছে, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে শিশু ইফাদ তার চাচাতো ভাই সামাদ (১১) ছাগল চড়ানোর জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর ঘণ্টাখানেক পরে সামাদ বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু রিফাত বাড়ি না ফেরায় স্বজনরা সম্ভাব্য স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এরপর বিকেল ৪টার দিকে মানিকের বাড়ির সামনের নির্মাণাধীন ড্রেনেজ থেকে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এঘটনায় শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পাগল প্রায় শিশুটির মা। আর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাঁর বাবা।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শিশু ইফাদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে শেষবারের মতো দেখতে। সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ তাঁর মা আহাজারি করছেন। তাকে শান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনরা।
এ সময় বিলাপ করতে করতে ইফাতের মা শারমিন আক্তার বলেন,, ওরে বুকে ধরি কি শান্তি, বুকি ধরবরে! ওহ আমার কোলে দেন, বুকি ধরবরে, বুকে ধরে কি শান্তি! আমি ওরে দেখে রাখতি পারি নাই।’
চাচা সামছুম আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘ একবছর আগে ড্রেনের জন্য খাল কাটেছে ঠিকাদার। কিন্তু এতোদিনেও কাজ শেষ হয়নি। সেখানে মানুষ সমান পানি জমে আছে। পানিতে পড়ে আমার ভাতিজার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর জন্য ঠিকাদার দায়ী। আমরা এর বিচার চাই।’
শিশুটির মামা স্বাধীন হোসেন বলেন, চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে ছাগল নিয়ে বাইরে গেছিল ইফাত নির্মাণাধীন ড্রেনে পড়ে যায়। পরে স্যান্ডেল দেখে ড্রেনের পানি থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ভাষ্য, সময় মতো ড্রেনেজের কাজ শেষ হলে এমনটা হতোনা।
সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় চিকিৎসাধীন শিশুটির বাবা কামরুল হাসান। তাঁর নাকে অক্সিজেন লাগানো রয়েছে। স্বজনরা তাকে শান্ত্বনা দিচ্ছেন। অসুস্থ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাজের বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে স্থানীয় লিটন আলী নামে এক ঠিকাদার কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে ঠিকাদার লিটন আলী প্রথমে বলেন, এলংগী এলাকায় ড্রেনেজের কাজ চলছে তাঁর। কাগজপত্রাদি দেখে বিস্তারিত বলা যাবে। পরে শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, তিনি কিছুই জানেন না। বাইরে গাড়িতে আছেন। পরে কথা বলবেন বলে ফোনটি কেটে দেন।
মর্মান্তিক এঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ইউএনও ও পৌরসভার প্রশাসক ফারজানা আখতার বলেন, ঠিকাদারের অবহেলা আছে কি না? তা ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, নির্মাণাধীন ড্রেনেজে জমে থাকা পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন