চিকিৎসক নেই, হয় না পরীক্ষা; হাওরবাসীর দুর্ভোগে

কিশোরগঞ্জ ইটনা উপজেলা ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ইটনা
সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো অনুযায়ী, একটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শুধু মূল হাসপাতাল ক্যাম্পাসটি সচল রাখতেই অফিশিয়াল অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আনুমানিক ৯০ থেকে ৯৮ জন ডেডিকেটেড জনবল থাকার কথা। আর মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনসহ হিসাব করলে মোট মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ২৫০ থেকে ৩০০ জনেরও বেশি। কিন্তু খাতা-কলমে থাকা এই বিশাল কাঠামোর কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না হাওরবেষ্টিত ইটনা উপজেলার লাখো মানুষ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট, শূন্যপদ, আবাসন সমস্যা এবং ডায়াগনস্টিক বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় হাওর অঞ্চলের একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি এখন নিজেই যেন ধুঁকছে।
ভৌগোলিক কারণে ইটনা উপজেলাটি একটি দুর্গম হাওর অঞ্চল। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং বর্ষা বা শুকনো—সব ঋতুতেই জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এমন একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই হাসপাতালের ভূমিকা যেখানে সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে হাসপাতালটি এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাশূন্য অবস্থায় রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এখানে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস, শিশু, নাক-কান-গলা এবং কার্ডিওলজি সহ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (বিশেষজ্ঞ ডাক্তার) থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এখানে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই।
হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা কতটা ভেঙে পড়েছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে এর ডায়াগনস্টিক বিভাগে। ৫০ শয্যার একটি হাসপাতালে এক্স-রে (X-Ray), আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG) এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার (Blood Test) মতো মৌলিক পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা থাকলেও, এখানে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না।
হাওর অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের পক্ষে সামান্য একটি রক্ত পরীক্ষা বা এক্স-রের জন্য মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে যাওয়া এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। শুকনো মৌসুমে ধু-ধু মাঠ আর বর্ষায় উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে শহরে যেতে যাতায়াত খরচই চলে যায় হাজার টাকা, তার ওপর বেসরকারি ক্লিনিকের চড়া ফি। ফলে অনেক দরিদ্র মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী এবং গর্ভবতী মায়েদের জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই হাসপাতাল কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না।
হাসপাতালের ল্যাব, রেডিওগ্রাফি বা এক্স-রে বিভাগে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল ও সচল যন্ত্রপাতির অভাবে এই বিভাগগুলো অচল। শুধু চিকিৎসকের পদই নয়, নার্সিং স্টাফ, প্রশাসনিক কর্মী এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী (ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী)-র তীব্র ঘাটতি রয়েছে এখানে।
এদিকে, চিকিৎসকদের এই দুর্গম অঞ্চলে ধরে রাখার পেছনে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবাসন সংকট। হাসপাতালে চিকিৎসকদের থাকার জন্য সরকারি যে কোয়ার্টার বা আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে, তা অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য। ভাঙাচোরা এবং মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত এই কোয়ার্টারগুলোতে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ফলে চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্তে থাকেন, যা হাওরের এই দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থায় জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসকদের হাসপাতালে উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা হাওরপাড়ের একজন ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের চারদিকে শুধু পানি। বর্ষায় নৌকা ছাড়া গতি নেই, তাও আবার খরচ অনেক। ডাক্তার দেখানোর পর কয়েকটা রক্ত পরীক্ষা আর একটা এক্স-রে দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বলল এখানে এসব হয় না, শহরে যেতে হবে। এই অবস্থায় রোগী নিয়ে অত দূরে শহরে যাওয়ার সামর্থ্য কি আমাদের মতো গরিবের আছে?”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন এমনিতেই প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই করে কাটে। তাদের এই মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে আর অবহেলা না করে দ্রুততম সময়ে ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রামসহ সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালু এবং চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। অন্যথায়, এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
আশা করি ইটনার সকল সচেতন নাগরিক এই বিষয়ে আমাদের এমপি মহোদয়ের কাছে দাবী যানাবে।
আর এও আশা করি আমাদের হাওরের চিকিৎসা উন্নত করবেন। এবং আমাদের জন্য এম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করবেন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন