বৃহস্পতিবার,৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নোবিপ্রবি গ্রন্থাগারে বৈধ আমদানিকৃত বই ফেরত দেওয়ার অভিযোগ আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের জন্য বৈধভাবে আমদানিকৃত বিদেশি একাডেমিক ও রেফারেন্স বই গ্রহণ না করে ফেরত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কার্যাদেশপ্রাপ্ত একাধিক পুস্তক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রকাশকদের মূল সংস্করণের বই সরবরাহ করার পরও সেগুলোকে ‘নিম্নমানের’ আখ্যা দিয়ে ফেরত দেওয়া হয়েছে, যা শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ নয়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
এ বিষয়ে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন বুক ডিস্ট্রিবিউশন হাউস (এএমবিডিএইচ)সহ কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে পৃথকভাবে লিখিত আবেদন জমা দিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
উপাচার্যের কাছে পাঠানো আবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যাদেশ অনুযায়ী বিদেশি প্রকাশক ও অনুমোদিত আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে সরাসরি আমদানিকৃত একাডেমিক, গবেষণা ও রেফারেন্স বই সরবরাহ করা হয়। এসব বই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থার মূল সংস্করণ এবং যথাযথ কাস্টমস ও আমদানি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশে আনা হয়েছে। কিন্তু সরবরাহের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বইগুলোর কাগজ, বাঁধাই ও ছাপার মান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সেগুলো গ্রহণ না করে ফেরত দেয়।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, বইগুলোর বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও বাহ্যিক মানের অজুহাতে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বিদেশি প্রকাশকদের কাছ থেকে বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে আমদানিকৃত এসব বই পুনরায় বাজারজাত করা বা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা সহজ নয়।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সহ-সভাপতি ড. আবু তৈয়ব আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে প্রকাশনা শিল্পের ধরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় অধিকাংশ বই বড় আকারে মুদ্রিত হলেও বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রকাশক প্রিন্ট অন ডিমান্ড (POD) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এ পদ্ধতিতে চাহিদা অনুযায়ী সীমিত সংখ্যক কপি ছাপানো হয়। ফলে কাগজ, বাঁধাই বা মুদ্রণের ধরনে আগের সংস্করণের তুলনায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই পার্থক্য কোনোভাবেই বইটির বৈধতা, কপিরাইট বা গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
আবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে দেশের বাজারে বিদেশি বইয়ের নামে অসংখ্য পাইরেটেড ও ফটোকপি সংস্করণ কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরকারি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে বৈধভাবে আমদানিকৃত মূল বই সংগ্রহ করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শুধুমাত্র বাহ্যিক গুণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বই মূল্যায়ন করলে প্রকৃত ও বৈধ প্রকাশনাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, তারা বইগুলোর বৈধতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র, প্রকাশকের অনুমোদন, আমদানি সংক্রান্ত দলিল এবং ইনভয়েস জমা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া ISBN নম্বর, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ডাটাবেজ এবং প্রকাশকের অফিসিয়াল তথ্য যাচাই করেই বইগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
তাদের অভিযোগ, দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানিকৃত বই ফেরত দেওয়ার ফলে একদিকে যেমন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানভান্ডার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, “যদি বৈধভাবে আমদানিকৃত এবং প্রকাশকের মূল সংস্করণের বইও গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে বই সরবরাহে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও একাডেমিক বই সংগ্রহ কঠিন হয়ে যেতে পারে।”
তারা আরও দাবি করেন, বইগুলো কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ডে ‘নিম্নমানের’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো স্পষ্ট করেনি। ফলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
শিক্ষা ও গবেষণা সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বর্তমান যুগে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের মূল বই সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ধরনের বিতর্ক দ্রুত সমাধান করে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন, যাতে একদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত না হয়।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

নোবিপ্রবি গ্রন্থাগারে বৈধ আমদানিকৃত বই ফেরত দেওয়ার অভিযোগ আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের জন্য বৈধভাবে