ইলিশের ভরা মৌসুম। সাগরে এখন মাছ ধরার ব্যস্ত সময়। কিন্তু সেই ব্যস্ততার বদলে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে দেখা দিয়েছে একের পর এক সংকট। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তীব্র বরফ সংকটে পড়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে শত শত মাছধরা ট্রলার বরফের অভাবে সাগরে যেতে পারছে না।
মৎস্যবন্দর দুটিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ আইস প্লান্ট স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালিয়ে বরফ উৎপাদন করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কমে গেছে বরফের সরবরাহ।
সংকটের সুযোগে বেড়েছে বরফের দামও। স্থানীয়ভাবে যে বরফের একটি ক্যান ১৫০ টাকায় বিক্রি হতো, সেটি এখন ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ জেলেদের। অতিরিক্ত দাম দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় বরফ মিলছে না।
জেলেদের ভাষ্য, একটি মাছধরা ট্রলার সাগরে যাওয়ার আগে খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য সরঞ্জামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বরফ সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু বরফ না পাওয়ায় মাছ ধরার মৌসুমেও ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন জেলেদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
জেলে আবদুর রহিম মিয়া বলেন, “আগে বিদ্যুৎ ভালো ছিল। এখন প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে বরফও কম তৈরি হচ্ছে। ১৫০ টাকার বরফ ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তারপরও প্রয়োজনমতো বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা জেলেরা সাগরে যেতে পারছি না।”
ট্রলার মালিক সুমন মিয়া বলেন, “সাগরে এমনিতেই তেমন মাছ পড়ছে না। এর মধ্যে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সাগরে যেতে চাইলেও বরফের অভাবে যেতে পারছি না। জেলেরা ঘাটে বসে বসে দিন কাটাচ্ছে। মৎস্যবন্দরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।”
মহিপুর গাজী আইস প্লান্টের স্বত্বাধিকারী মো. মজনু গাজী বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২-১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। এতে বরফ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর দিয়ে বরফ উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাই বরফের দামও আগের চেয়ে বেড়েছে। উৎপাদন কম হওয়ায় শত শত মাছধরা ট্রলার
মহিপুর-আলীপুর ঘাটে বসে আছে। আমরা সরকারের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানাচ্ছি।”
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, “বিদ্যুতের সমস্যা দেশব্যাপী। তারপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। মৎস্যবন্দরে আপাতত বিকল্পভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা দেখা হচ্ছে। আর বরফের দাম বাড়ানোর বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বরফ তৈরিতে সমস্যা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের সঙ্গে আলোচনা করে মৎস্যবন্দরের জন্য বিশেষভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা দেখা হবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর দিয়ে বরফ তৈরি করতে হচ্ছে, তাই কিছুটা দাম বেড়েছে। তবে এই সুযোগে যেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া না হয়, সেটিও আমরা দেখছি।”
মৎস্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহিপুর-আলীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। ইলিশের মৌসুমে এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মাছধরা ট্রলার সাগরে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ ও বরফ সংকট অব্যাহত থাকলে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তাদের দাবি, ইলিশের ভরা মৌসুমে মৎস্যবন্দর দুটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বরফের উৎপাদন ও ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।




