শিবচরে পহেলা বৈশাখের রঙে প্রাণ ফিরে পেল মৃৎশিল্পীরা

মাদারীপুরের শিবচরে চুল্লিতে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, আর চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে পোড়া মাটির গন্ধ। আঠালো মাটিতে হাত ডুবিয়ে ঘুরছে চাক—তাতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে হাঁড়ি-পাতিল,বাসন, ঢাকনা ,কলস, পুতুল, ব্যাংক ও নানা ধরনের খেলনা। যেন নিস্তব্ধ মাটির ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছে এক জীবন্ত শিল্প।
  শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের পালপাড়া এখন যেন ছোট ছোট কারখানার সমাহার। প্রতিটি ঘরেই চলছে মাটির তৈজসপত্র তৈরির কর্মযজ্ঞ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীরাও অংশ নিচ্ছে কাজে। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বিক্রি বাড়ার আশায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
শিবচরে বৈশাখ এলেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, এই শতবর্ষী ঐতিহ্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা মৃৎশিল্প এখনও টিকে আছে কুমারপাড়ার কয়েকটি পরিবারের হাতে। তবে আগের মতো চাহিদা না থাকায় ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে এই পেশা।
পালপাড়ায় ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাটির কাজ। মাটি কাটা, বালুর সঙ্গে মিশিয়ে প্রস্তুত করা, চাক ঘুরিয়ে আকৃতি দেওয়া, রোদে শুকানো—এরপর চুল্লিতে ২৪ থেকে ৩০ ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয়। একটি সম্পূর্ণ ব্যাচ প্রস্তুত করতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন।
এই কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। কেউ মাটি কেটে আনছেন, কেউ পা দিয়ে মাটি মাখছেন, কেউ তৈরি পণ্য শুকাতে দিচ্ছেন, আবার কেউ নকশা ও রংয়ের কাজ করছেন।
একসময় এখানকার মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল ও খেলনার ব্যাপক চাহিদা ছিল স্থানীয় হাট-বাজারে। কিন্তু প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের পণ্যের প্রসারে সেই চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
তবে বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ মেলা ও গলিয়া মেলার মতো উৎসবগুলোতে কিছুটা চাহিদা থাকায় এখনো আশা ছাড়েননি কারিগররা। ভালোবাসা, শ্রম আর ঐতিহ্যের টানে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পৈতৃক এই পেশা।
মৃৎশিল্পী ভবন পাল বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই কাজ করতেন। আমরাও সেই ধারাই ধরে রেখেছি। অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ হয়নি। এই কাজই আমাদের জীবিকার একমাত্র ভরসা। সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরও ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারতাম।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান জানান,
ভদ্রাসনের মৃৎশিল্প আমাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারিগররা আগ্রহী হলে তাদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণসহ বিভিন্ন সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে এই শিল্প টিকে থাকে এবং আরও সমৃদ্ধ হয়।
ঐতিহ্য আর সংগ্রামের মিশে টিকে থাকা এই মৃৎশিল্প এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে—বৈশাখের রঙে রাঙিয়ে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন