একজন শিক্ষক চাইলে শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠই নয়, একটি প্রজন্মের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎও গড়ে তুলতে পারেন। আর সেই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার গরীব পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছাঃ আর্জিনা খাতুন। টানা ১০ বছর ধরে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে তাদের পছন্দের ফলদ গাছের চারা তুলে দিয়ে তিনি শুধু গাছই উপহার দিচ্ছেন না, রোপণ করছেন পরিবেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার বীজ।
দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গরীব পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছাঃ আর্জিনা খাতুন ২০২৪ সালে নবাবগঞ্জ উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলার রামপুর (বাজার) গ্রামের মতিয়ার রহমানের কন্যা এবং মোঃ তমিজ উদ্দিনের সহধর্মিণী।
২০০৬ সালে হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে গোলাপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গরীব পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা নয়, বরং একটি সামাজিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ২০১৬ সালে প্রথমবার বিদায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে তাদের পছন্দের ফলদ গাছের চারা তুলে দেন তিনি। এরপর থেকে একটানা ১০ বছর ধরে প্রতিবছর পঞ্চম শ্রেণির প্রতিটি বিদায়ী শিক্ষার্থীকে একটি করে তাদের পছন্দের চারাগাছ উপহার দিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মাঝেও তিনি নিয়মিত চারাগাছ বিতরণ করেন।
২০১৬ সালের বিদায়ী শিক্ষার্থী ফয়সাল আরাফাত বলেন, ম্যাডামের দেওয়া আমড়া গাছের চারাটি আমি বাড়িতে লাগিয়েছিলাম। অনেক যত্ন নিয়েছি। এখন সেই গাছে ফল ধরে। যখন সেই আমড়া খাই, তখন আমার স্কুল আর ম্যাডামের কথা মনে পড়ে।
২০২৫ সালের শিক্ষার্থী মোছাঃ আফসানা মিমি জানায়, বিদায়ের সময় ম্যাডাম আমাকে একটি আমড়া গাছের চারা দিয়েছেন। আমি সেটি বাড়িতে লাগিয়েছি। গাছটি এখন অনেক সুন্দর হয়েছে। ভবিষ্যতে আমি ডাক্তার হতে চাই। ডাক্তার হলে আমিও শিক্ষার্থীদের মাঝে এভাবে চারাগাছ বিতরণ করব।
আফসানার মা ফেরদৌসী বেগম বলেন, আর্জিনা খাতুন ম্যাডামের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি শুধু একজন ভালো শিক্ষকই নন, একজন ভালো মানুষও। তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনা রইল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকলিমা খাতুন বলেন, আর্জিনা খাতুন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ একজন শিক্ষক। গত ১০ বছর ধরে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিদায়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের পছন্দের চারাগাছ বিতরণ করে আসছেন। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করছে, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করছে এবং তাদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম গড়ে তুলছে। তাঁর এই উদ্যোগ অন্য শিক্ষকদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
মোছাঃ আর্জিনা খাতুন বলেন, একটি সুন্দর জীবন গড়তে হলে সুন্দর পরিবেশ দরকার। আর সুন্দর পরিবেশ গড়তে হলে গাছের কোনো বিকল্প নেই। চারপাশ সবুজ হলে মনও ভালো থাকে। সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। এ বছর আমার এই উদ্যোগের ১০ বছর পূর্ণ হলো। আমার প্রধান শিক্ষক ও সহকর্মীরা সব সময় আমাকে সহযোগিতা করেন। ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চাই।
একটি চারাগাছ হয়তো দেখতে ছোট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই বড় হয়ে ছায়া দেয়, ফল দেয়, নির্মল বাতাস দেয়। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় একজন শিক্ষকের ভালোবাসা, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার কথা।
আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে বিশ্ব উদ্বিগ্ন, তখন একজন শিক্ষকের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। আর্জিনা খাতুন প্রমাণ করেছেন, একজন শিক্ষক চাইলে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল পেরিয়ে সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তনের বীজ বপন করতে পারেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু নবাবগঞ্জ নয়, সমগ্র দেশের শিক্ষকদের জন্য হতে পারে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এ.কে.এম. আঃ ছালাম বলেন, মোছাঃ আর্জিনা খাতুন ২০২৪ সালে নবাবগঞ্জ উপজেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে টানা ১০ বছর ধরে ফলদ গাছের চারা বিতরণসহ পরিবেশবান্ধব ও মানবিক যে উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাঁর এই ব্যতিক্রমী কার্যক্রম শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝেও ইতিবাচক প্রেরণা সৃষ্টি করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। পরিবেশ সংরক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে তাঁর এই উদ্যোগ একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।




