রাত ১২টা ১ মিনিট। চারদিকে নীরবতা। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কালিরহাট বাজারে একে একে জ্বলে ওঠে ৬৮টি মোমবাতি। প্রতিটি শিখা যেন স্মরণ করিয়ে দেয় রাষ্ট্রহীনতার ৬৮ বছরের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা ও পরিচয়হীন জীবনের ইতিহাস। একই সঙ্গে প্রতীকীভাবে শুরু হয় বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের ১১তম বর্ষপূর্তি উদযাপন এবং এক যুগে পদার্পণের ঘোষণা।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে দাসিয়ারছড়াসহ আশপাশের সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমী আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। পরে দাসিয়ারছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আলোচনা সভা, মোমবাতি প্রজ্বালন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাসিম পারভেজ এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান জোবায়ের হিমেল। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান মুকুল, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি লোকমান হোসেন, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সামসুজ্জামান হাসুসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, “ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে হাজারো মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ভোটাধিকার, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পেয়েছে। তবে উন্নয়নের মূলধারায় তাদের সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করতে এখনো অনেক কাজ বাকি।”
বাংলাদেশ-ভারত সাবেক ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক সভাপতি আলতাব হোসেন বলেন, “এ দিনটি আমাদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি আত্মসমালোচনারও। নাগরিকত্ব পেয়েছি, কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো বহু দাবি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।”
আয়োজকরা জানান, নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্রহীন জীবনের ইতিহাস জানানো এবং অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই প্রতিবছর এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের এক যুগ পূর্ণ হতে চললেও অনেক এলাকায় এখনো মানসম্মত সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। উন্নত চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভূমির রেকর্ড ও নামজারি-সংক্রান্ত জটিলতার স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
তাদের ভাষ্য, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা মানুষের জীবনমানের উন্নয়নেও প্রতিফলিত হতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূলধারায় সাবেক ছিটমহলের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কার্যকর হওয়া বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহলের বিনিময় সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষের ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীন জীবনের অবসান ঘটে এবং তারা নিজ নিজ দেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ৬৮টি মোমবাতির আলোয় রাষ্ট্রহীন জীবনে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মরণ করা হয়। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন, মর্যাদাপূর্ণ ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা।
দাসিয়ারছড়া এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।




