মাটির ঘর থেকে পাঁচতলা ভবন, এবার সবুজের অভিযানে ভবানীপুর কামিল মাদরাসা

মাটির ঘর থেকে আধুনিক পাঁচতলা ভবন—দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টায় বদলে গেছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভবানীপুর ইসলামীয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসার চিত্র। প্রায় সাত একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানটি এখন ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষারও অন্যতম কেন্দ্র। দীর্ঘ এই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় এবার শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সবুজ বিপ্লবের প্রত্যয় নিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মাদরাসা প্রাঙ্গণে ‘সবুজে-সবুজে দেশ গড়ার’ প্রত্যয়ে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার শাহনেওয়াজ। মাদরাসার অধ্যক্ষ হাসান মাসুদ-এর সভাপতিত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। এ সময় মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বৃক্ষ মানুষের জীবন ও পরিবেশের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। গাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বায়ু বিশুদ্ধকরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সবুজায়নের আন্দোলনে যুক্ত হতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি থেকে প্রতিষ্ঠানের জন্ম
ভবানীপুর ইসলামীয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেহেরউদ্দীন মন্ডল শহীদ হওয়ার পর তাঁর দুই সন্তান মনিরউদ্দীন মন্ডল ও গোলাম মুর্তজা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও শিক্ষার প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে মাদরাসাটি।
তবে শুরুর পথটি মোটেও সহজ ছিল না। মাটির ঘর, সীমিত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই পরিচালিত হতো শিক্ষা কার্যক্রম। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন বাড়লেও উন্নয়নের গতি ছিল সীমিত। এমন এক সময়ে ১৯৯৭ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন হাসান মাসুদ।
অধ্যক্ষ হাসান মাসুদের নেতৃত্বে বদলে যায় চিত্র
অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে নতুন পরিকল্পনা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা এবং অধ্যক্ষের নিরলস প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে মাদরাসার চেহারা। একসময়ের মাটির ঘর পেরিয়ে নির্মিত হয় আধুনিক ভবন। শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে ওঠে।
আজ সেই প্রতিষ্ঠানেই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক পাঁচতলা ভবন। প্রায় সাত একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মাদরাসা ক্যাম্পাস এখন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মনোরম ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে। শুধু ভবন নির্মাণেই থেমে থাকেনি উন্নয়নের এই যাত্রা; সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমেও আনা হয়েছে বৈচিত্র্য।
বর্তমানে মাদরাসাটিতে কামিল শ্রেণির পাশাপাশি অনার্স, বিএমটি ও ভোকেশনাল কোর্স চালু রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও যুগোপযোগী হয়েছে।
শিক্ষার আলো থেকে এবার সবুজের আলো
ভবানীপুর ইসলামীয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসার বর্তমান অগ্রযাত্রাকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা লাভ করে।
সেই লক্ষ্যেই এবার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাদরাসা প্রাঙ্গণে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে সবুজায়ন কর্মসূচি পরিচালনার প্রত্যাশাও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
এলাকাবাসীর মতে, ভবানীপুর ইসলামীয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসার এই পরিবর্তন একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি একটি এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। যে প্রতিষ্ঠান একসময় মাটির ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটিই আজ আধুনিক ভবন, বহুমুখী শিক্ষা কার্যক্রম ও সবুজ পরিবেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা, ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও পরিবেশ—এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে ভবানীপুর ইসলামীয়া কামিল মাস্টার্স মাদরাসা আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর। তাঁদের বিশ্বাস, মাটির ঘর থেকে পাঁচতলা ভবনে উন্নীত হওয়ার এই গল্প একদিন আরও বড় সাফল্যের ইতিহাস হয়ে উঠবে; আর সেই সাফল্যের ছায়ায় বেড়ে উঠবে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক ও পরিবেশবান্ধব নতুন প্রজন্ম।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন